তেলের দাম বাড়াতে বিপিসির বারবার অস্বাভাবিক প্রস্তাব
ছবি: সংগৃহীত
হাসনাইন ইমতিয়াজ, ঢাকা ও তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০১ | আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় লাফ দিতে চায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। দাম বাড়ানোর বিষয়টি সরকার কানে না তুললেও সংস্থাটি ‘আদাজল খেয়ে লেগেছে’। প্রতি মাসেই তারা অস্বাভাবিক দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে।
জুলাইয়ের প্রস্তাবে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৪ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। এর আগে মে মাসে বিপিসি ডিজেলের দাম লিটারে ২৩৫ টাকা করার প্রস্তাব করেছিল। এমনকি মূল্য সমন্বয় করা না হলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি সরকারের কাছে ১২ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দাবি করেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির একই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিপিসির এই ধারাবাহিক দর বাড়ানোর প্রস্তাব নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং লাভ-লোকসানের হিসাব নিয়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে এখন লোকসানের কথা বলা হলেও এক দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করে এসেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতের লাভের একটি অংশ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল গঠন করা হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে বারবার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার প্রয়োজন হতো না। পাশাপাশি বিপিসির আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ নিরীক্ষার অভাব নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসের ২০ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারদর পর্যালোচনা করে দর সমন্বয়ের প্রস্তাব পাঠায় বিপিসি। এ বছরের এপ্রিল, মে ও জুলাইয়ের জন্য পাঠানো প্রস্তাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিবারই দেশের বাজারে দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এপ্রিলের প্রস্তাবে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫৬ টাকা, অকটেন ১৪৯ টাকা, পেট্রোল ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৪১ টাকা করার কথা বলা হয়। প্রথমে দাম অপরিবর্তিত রাখে সরকার। পরে ১৯ এপ্রিল ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
মে মাসের প্রস্তাবে ডিজেল ২৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৬ টাকা, পেট্রোল ১৬২ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৮ টাকা করার সুপারিশ করে বিপিসি। কিন্তু সরকার দাম অপরিবর্তিত রাখে।
জুনে ডিজেল ১৭৬ টাকা, অকটেন ১৬১ টাকা, পেট্রোল ১৫৭ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৩ টাকা করার প্রস্তাব পাঠানো হয়। সরকার ডিজেলের দাম ঠিক রেখে অন্যান্য তেলের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ায়।
আর সর্বশেষ জুলাইয়ের জন্য জুনে পাঠানো প্রস্তাবে বিপিসি অন্য তিনটি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে শুধু ডিজেলের দাম ১৫৪ টাকা করার সুপারিশ করে। তবে সরকার সব জ্বালানির দরই অপরিবর্তিত রাখে। আগস্টেও তেলের দাম বাড়ানো হয়নি।
এ ব্যাপারে বিপিসির পরিচালক (অর্থ) ও সরকারের যুগ্ম সচিব নাজনীন পারভীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করায় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। অতীতে সংরক্ষিত অর্থ থেকেই এখন আমদানি খরচ মেটানো হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় না করায় তাদের প্রায় ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
তবে বিপিসির এই হিসাব নিয়েই মূলত আপত্তি বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, বিপিসি যে অঙ্ককে লোকসান বা ঘাটতি হিসেবে তুলে ধরছে, তার বড় অংশই আসলে অতীতে অর্জিত উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে মেটানো হচ্ছে। প্রকৃত আর্থিক অবস্থার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ছাড়া এই দাবির সত্যতা যাচাই সম্ভব নয়। তাই বিপিসির অতীতে অর্জিত বিপুল মুনাফা, সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া অর্থ এবং তাদের নিরীক্ষা প্রক্রিয়া সবকিছুই নতুন করে পর্যালোচনার দাবি উঠছে।
১১ বছরে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা
বিপিসির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগের বছরগুলোতে লোকসান করলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করতে শুরু করে সংস্থাটি। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৫১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা মুনাফা করে বিপিসি। অর্থাৎ এই সময়ে বছরে গড়ে লাভ হয়েছে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার বেশি।
এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মুনাফা ছিল ৪ হাজার ২১২ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে দাম কমায় লাভ বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ হাজার ৫৫১ কোটি, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬ হাজার ৫৩৩ কোটি এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় মুনাফা কমে ৩ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকায় নামে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে আবার ৫ হাজার ৬৫ কোটি টাকা লাভ করে সংস্থাটি।
এরপর করোনা মহামারির সময় বিশ্ববাজারে তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে নেমে গেলে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিসির মুনাফা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৯২ কোটি টাকা, যা একক অর্থবছরে তাদের সর্বোচ্চ। ২০২১-২২ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক বাজারে দর বাড়লে ২ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা লোকসানের দাবি করে বিপিসি। ওই লোকসানের যুক্তি দেখিয়ে ২০২২ সালের আগস্টে দেশের ইতিহাসে রেকর্ড হারে (প্রায় ৪৭ শতাংশ) জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। তবে এর পরের বছরেই (২০২২-২৩) আবার ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা মুনাফা করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লাভ হয় ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জিত হয়।
শুধু মুনাফাই নয়; ভ্যাট, কর, লভ্যাংশ ও উদ্বৃত্ত মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারেও বিপুল অর্থ জমা দিয়েছে বিপিসি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তারা জমা দেয় ১৫ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা। এর আগের বছর লোকসানের দাবির পরও কোষাগারে জমা দেওয়া হয় ১৫ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে জমা দেওয়া হয়েছিল ১৫ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ভ্যাট-কর ও লভ্যাংশ বাবদ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা গেছে।
হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন
বিপিসির আর্থিক হিসাবের ধরন ও নিরীক্ষা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন তুলে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা না হওয়ায় লাভ-লোকসানের সঠিক চিত্র প্রকাশ পায় না।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, বিপিসির আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার মানসম্মত নিরীক্ষার প্রস্তাব দিলেও তা করা হয়নি। একদিকে লোকসানের কথা বলা হয়, অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লাখ লাখ টাকা বোনাস নেন। মূল্য নির্ধারণ কার্যত বিপিসির নিয়ন্ত্রণে। ফলে লাভ-লোকসানের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যায়।
তিনি আরও বলেন, ডিজেলের দাম বাড়িয়ে হয়তো বিপিসি কয়েকশ কোটি টাকা অতিরিক্ত আয় করবে; কিন্তু এর প্রভাব পড়বে পরিবহন ভাড়া, কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নিত্যপণ্যের বাজারে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচের বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে একটি স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলা থাকলেও তাতে ত্রুটি রয়েছে। কারণ এতে ভ্যাট, কর ও নির্দিষ্ট মুনাফা ধরে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যেটাই হোক, বিপিসির লাভের সুযোগ থেকেই যায়।
তিনি বলেন, বিপিসি কয়েক বছর ধরে গড়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। সেই উদ্বৃত্ত অর্থের একটি অংশ দিয়ে আপৎকালীন তহবিল গঠন করা হলে অস্থিরতার সময় সেখান থেকেই ভর্তুকি দেওয়া যেত। কিন্তু সেই লাভের অর্থ অন্য খাতে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা নীতিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
- বিষয় :
- তেলের দাম
- বিপিসি
- জ্বালানি তেল