ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

ট্রাইব্যুনালে ফোনালাপের রেকর্ড দাখিল

গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট ধীর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের

গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট ধীর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ওবায়দুল কাদের
×

ওবায়দুল কাদের ও জুনাইদ আহমেদ পলক

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ২০:৫০

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় প্রথমেই ইন্টারনেট ধীর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন সাবেক সেতু ও যোগাযোগমন্ত্রী, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে এ নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমতি নেওয়ার কথা জানান সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। রোববার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ওবায়দুল কাদের ও জুনাইদ আহমেদ পলকের এমন একটি ফোনালাপের রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২-এ এদিন যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।

ফোনালাপটিতে সাবেকমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, ‘নেটটা একটু স্লো করে দাও।’ জবাবে পলক বলেন, ‘একটু নেত্রীর (শেখ হাসিনা) অনুমতিটা নিয়ে নেই?’ কাদের তখন বলেন, ‘নিয়ে নাও।’ পরে কাদেরের সঙ্গে কথোপকথনে পলক আবার জানান, শেখ হাসিনার অনুমতি নিয়েই বিষয়টি করতে হবে। প্রসিকিউশনের দাবি, জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কাদের ও পলকের কথোপকথনটি এ মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এনটিএমসির মাধ্যমে ফোনকল নজরদারি ও রেকর্ড করা হতো উল্লেখ করেন প্রসিকিউটর তামিম। তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউকেই বিশ্বাস করতেন না বলে দাবি করেছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনার আমলে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির ফোনকল নজরদারি ও রেকর্ড করা হতো।

জুলাই আন্দোলন দমনে কোথায় কী ধরনের বৈঠক ও যোগাযোগ হয়েছিল, সেসবের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন গাজী এমএইচ তামিম। একইসঙ্গে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশের পৃথক দুটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শোনানো হয়। এছাড়া আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের বেশ কয়েকটি কথোপকথনের উদ্ধৃতিও তুলে ধরেন প্রসিকিউটর তামিম।

পরে সাংবাদিকদের তামিম বলেন, ট্রাইব্যুনালে ১৪টি কথোপকথন উপস্থাপন করা হয়েছে। শুরুতেই ওবায়দুল কাদের ও জুনাইদ আহমেদ পলকের একটি কথোপকথন শোনানো হয়, যা এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালে দালিলিক প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে। এই কথোপকথনে তিনটি বিষয় উঠে এসেছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। পরে শেখ হাসিনার অনুমোদন নিয়ে তা কার্যকর করেন পলক।

তিনি বলেন, বিষয়টি শুধু কথোপকথনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে দেশের ৫৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে থ্রি-জি ও ফোর-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশনা জারি করেছিল সরকার। শুধু তাই নয়, আন্দোলন চলাকালে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটি ‘সিস্টেম ক্রাইম’-এর একটি অংশ।

তামিম বলেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে চট্টগ্রামের তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের কথোপকথনের পরপরই ১৬ জুলাই ওয়াসিমসহ তিনজনকে আওয়ামী লীগের নেতারা গুলি চালিয়ে হত্যা করেন। এছাড়া ওবায়দুল কাদের ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনেও আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে ট্যাগ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তাঁদের কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী, জঙ্গি, বিএনপি-জামায়াত ও রিলিজিয়াস অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি উঠে এসেছে। হাছান মাহমুদ বলেছিলেন, আন্তর্জাতিকভাবে ‘জঙ্গি’ শব্দটি গুরুত্ব পায়। তাই এ শব্দ ব্যবহার করা হলে আন্তর্জাতিক বিশ্ব আমাদের পক্ষে কথা বলবে।

এ সময় শেখ হাসিনার একটি কথোপকথনের উদ্ধৃতি তুলে ধরে তামিম বলেন, ‘ওরা তো আমাদের অনেক কিছু পোড়াইছে। ওদের বাড়িঘর সব পোড়ায় দে। ওদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে না? সেগুলো পোড়ায় দে। এখন শুধু একটাই কাজ, সময়মতো বসে থাকবা, আর ওদের ঘরবাড়িতে আগুন দিবা।’ এমন ১৪টি কথোপকথনই সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।

রোববার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এ মামলায় ওবায়দুল কাদেরসহ আসামি সাতজন। অন্যরা হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। আসামিরা সবাই পলাতক।

এর আগে, গত ৬ আগস্ট ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের একটি ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হয়। কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের মারার জন্য উসকে দিয়ে উৎসাহিত করেন কাদের।

আরও পড়ুন

×