সমকালীন প্রসঙ্গ
কেন বাংলাদেশকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কথা শুনতে হবে
ফাইল ছবি
খায়রুল চৌধুরী
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৩৪
প্রতিবছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস এলেই বাংলাদেশে একটি পুরোনো কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্ন সামনে আসে– এ দেশের আদিবাসী আসলে কারা? আলোচনার সিংহভাগই আটকে থাকে বিভিন্ন নামের বিতর্কে– তাদের কি ‘আদিবাসী’, ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ নাকি ‘নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী’ বলা হবে? এর সঙ্গে যোগ হয় কে কখন কোথা থেকে এসেছে, সেই বিতর্ক। এসব নাম ও পরিচয়ের বিতর্কে আমরা এতটাই ব্যস্ত থাকি, তারা যে একটি ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠী, তারা কী রক্ষা করতে চায় এবং তাদের টিকে থাকা বাংলাদেশের জন্য কেন জরুরি– সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো আড়ালেই থেকে যায়।
বিষয়টিকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যাক। ‘আদিবাসী’ বলতে মূলত এমন একটি প্রথাগত ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক ব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরে গড়ে উঠেছে; অনেক ক্ষেত্রে এই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে ওঠার বহু আগে থেকেই। সেই অর্থে তারা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারায় রাজনৈতিকভাবে ‘রাষ্ট্রহীন’ হলেও নাগরিক অধিকারহীন মানুষ নন। উদাহরণস্বরূপ, একজন চাকমা, মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, গারো বা সাঁওতাল একই সঙ্গে বাংলাদেশের একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক এবং এমন একটি স্বাতন্ত্র্যসূচক জনগোষ্ঠীর অংশ, যাদের সমষ্টিগত ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভূমির সম্পর্ক এই আধুনিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির বহু আগে থেকেই বিদ্যমান। এই ঐতিহাসিক সত্য স্বীকার করে নিলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ক্ষুণ্ন হয় না কিংবা এর সার্বভৌমত্বও দুর্বল হয় না; বরং বাংলাদেশের সমাজের যে বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী বাস্তব রূপ রয়েছে, তা-ই সার্থকভাবে প্রতিফলিত হয়।
কিন্তু আজ এই বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ একুশ শতকে এসে তথাকথিত ‘সংখ্যালঘু সমস্যা’টি আর ছোট কোনো বিষয় নয়, এটি একটি বড় মানবিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। আমরা যে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সভ্যতা গড়ে তুলেছি, তা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর; কিন্তু তা পরিবেশ ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে, যা প্রকারান্তরে মানুষের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি। ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আমরা বেশি উৎপাদন ও ভোগ করছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা বন উজাড় করছি, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছি, নদী মেরে ফেলছি এবং জলবায়ুকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছি। প্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো আমাদের তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু প্রযুক্তি একা আমাদের এটি শেখাতে পারবে না যে, যে-পৃথিবী আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, তাকে ধ্বংস না করে কীভাবে আমরা এখানে শান্তিতে বসবাস করতে পারি।
ঠিক এখানেই আদিবাসী সমাজের কাছে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যা উপেক্ষা করার সামর্থ্য কোনো আধুনিক রাষ্ট্রের নেই। এর অর্থ আদিবাসী জীবনকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে অতি রোমান্টিক করে দেখা নয় বা তারা প্রকৃতির চিরন্তন রক্ষক– এমনটি ভাবাও নয়; কারণ অন্য সব সমাজের মতো তাদের সমাজেও বৈষম্য, দ্বন্দ্ব ও পরিবর্তন রয়েছে। তাদের মূল গুরুত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নির্দিষ্ট বন, পাহাড়, নদী ও পরিবেশের সঙ্গে বসবাস করে তারা যে গভীর জ্ঞান ও প্রথাগত সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে তার মধ্যে নিহিত। তাদের ভাষার গভীরে উদ্ভিদ, প্রাণী ও ভূপ্রকৃতির জ্ঞান সঞ্চিত থাকে, প্রথাগত নিয়ম দিয়ে তারা সম্পদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করে এবং সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে পরিবেশে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি ধরে রাখে। কোনো বন কেবল মানুষের ভালোবাসায় টিকে থাকে না, বরং বনের ব্যবহার, বনের সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তা সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিয়মই বনকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই একটি আদিবাসী সমাজ হারিয়ে গেলে আমরা শুধু কিছু ভাষা, গান, পোশাক বা উৎসবই হারাই না, বরং মানুষ ও প্রকৃতির টেকসই সম্পর্কের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত অমূল্য জ্ঞানকেও হারিয়ে ফেলি। এ কারণেই জীববৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈচিত্র্যকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই সত্যটি অনুধাবন করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক চিন্তাকাঠামোয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত আলোচনা দীর্ঘদিন যাবৎ মূলত উন্নয়ন, জনকল্যাণ কিংবা নিরাপত্তার মতো কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে সামাজিক আলোচনায় আদিবাসীদের পরিচয় ও অধিকারের প্রশ্নটিকে বহুলাংশে অর্থনৈতিক সাহায্য-সহযোগিতা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সমীকরণে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এই ধরনের সংকীর্ণ ও একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে একটি অত্যন্ত মৌলিক ও রাষ্ট্রচিন্তামূলক প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থেকে গেছে। তা হলো, এই স্বাতন্ত্র্যময় জনগোষ্ঠীগুলো কীভাবে তাদের নিজস্ব পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে একটি একক ও অভিন্ন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ ও সমমর্যাদাপূর্ণ অংশীদার হতে পারে?
পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে এই দৃষ্টিভঙ্গিগত সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে প্রকট। কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমি, প্রথাগত কর্তৃত্ব, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানের দাবিকে রাষ্ট্রীয় একক কর্তৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে; কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিতে এই দাবিগুলোর তাৎপর্য ভিন্ন। এর কেন্দ্রে বিদ্যমান অত্যন্ত যুক্তিসংগত একটি দাবি: বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বজায় রেখেই স্বকীয়তা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি; কারণ এটিকে কেবল একটি দীর্ঘায়িত সশস্ত্র সংঘাত নিরসনের সাময়িক সমাধান হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রচিন্তামূলক তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত আঞ্চলিক পরিষদ, পার্বত্য জেলা পরিষদ, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলো ছিল বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণের বলিষ্ঠ প্রচেষ্টা। ফলে প্রায় তিন দশক অতিক্রম করার পরও চুক্তির মৌলিক বিধানগুলোর অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন কেবল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অসন্তোষের কারণ নয়; বরং তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ক্ষেত্রেও একটি অসমাপ্ত পরীক্ষা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই সংকট নিরসন এত জটিল রূপ ধারণ করল কেন? এর একটি কারণ রাজনৈতিক হলেও অপর গুরুত্বপূর্ণ কারণটি জ্ঞানতাত্ত্বিক। সমাজতাত্ত্বিক বিচারে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী অত্যন্ত সহজভাবে নিজেদের অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন অভিজ্ঞতার মানদণ্ড বলে বিবেচনা করে। প্রবল ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এবং কেন্দ্রমুখী প্রশাসনিক কাঠামোয় অভ্যস্ত বাঙালি সমাজের দৃষ্টিতে ‘সমান নাগরিকত্ব’ ধারণাটি সমরূপ বা অভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রূপ নিতে পারে। তবে ঐতিহাসিকভাবে স্বতন্ত্র আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে সমতার সংজ্ঞা ভিন্ন; তাদের কাছে সমতার অর্থ হলো ভূমি, সংস্কৃতি ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন এক ন্যূনতম আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার, যা নাগরিকত্বের ছদ্মাবরণে তাদের স্বকীয়তাকে বিলীন করার প্রক্রিয়া থেকে সুরক্ষা দান করে।
ড. খায়রুল চৌধুরী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক; পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়ক
- বিষয় :
- আদিবাসী