আন্তর্জাতিক
ইরানের রণকৌশল যেভাবে বদলে দিল যুদ্ধের সমীকরণ
খন্দকার মো. মাহফুজুল হক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের সর্বশেষ পর্যায়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কয়েক দিন আগেও তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদারের হুমকি দিচ্ছিলেন। কিন্তু পরে তিনি যুদ্ধের অবসান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার কথা বলেন। হঠাৎ এই অবস্থান পরিবর্তন ইঙ্গিত দেয়– যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা ওয়াশিংটনের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভাব্য চুক্তির ব্যাপারে অগ্রগতির দাবি করলেও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিস্তৃত চুক্তির কথা এখনও নিশ্চিত করেনি, তবে ওমানের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে কিছু আলোচনা এগিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইরানের কৌশলগত সুবিধা শুধু হরমুজ প্রণালিতে সীমাবদ্ধ নয়। একই সময়ে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব প্রণালিও নতুন করে বৈশ্বিক উদ্বেগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বাহিনী ওই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
পারস্য উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর ও ইউরোপমুখী জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের বড় অংশ এই দুটি জলপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে একদিকে হরমুজে ইরানের চাপ, অন্যদিকে বাব আল-মান্দেবে হুতিদের হামলা; এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, বীমা ব্যয় এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ক্রমেই বাড়িয়ে তুলেছে। অপরদিকে যুদ্ধের ছয় মাস পার হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্র তার ঘোষিত কৌশলগত লক্ষ্য কতটা অর্জন করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ওয়াশিংটনের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু সামরিক শক্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা আছে, সেই বাস্তবতাও মানতে হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের যুদ্ধকৌশল বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। বহু বছর ধরে ইরান যে প্রতিরক্ষা ভিত গড়ে তুলেছে, সেটি সাধারণভাবে মোজাইক ডিফেন্স নামে পরিচিত। এর মূল ধারণা হলো যুদ্ধ পরিচালনাকে একটি কেন্দ্রীয় সদরদপ্তরের ওপর নির্ভরশীল না রেখে বিকেন্দ্রীভূত করা। অর্থাৎ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৃথক কমান্ড কাঠামো, স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা। মোজাইক ডিফেন্সের আরেকটি দিক হলো উত্তরাধিকারভিত্তিক নেতৃত্ব ব্যবস্থা। এই সিস্টেমে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার নিহত হলে বিকল্প নেতৃত্ব দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে। এতে নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমে যায় এবং যুদ্ধ পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
এই কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘অসম যুদ্ধ’। যুক্তরাষ্ট্রের মতো সামরিক পরাশক্তির সঙ্গে একই ধরনের অস্ত্র ও যুদ্ধ পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতায় না গিয়ে ইরান এমন এক কৌশল গ্রহণ করেছে, যেখানে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল কিন্তু কার্যকর অস্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের সামরিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ব্যয় বহুগুণ করতে সক্ষম হয়েছে। স্বল্পমূল্যের ড্রোন, বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, দ্রুতগতির ছোট ছোট নৌযান, সামুদ্রিক হুমকি এবং আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোকে সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান এমন একটি বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য প্রচলিত সামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা ক্রমেই ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান মূলত প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে দেওয়ার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করেছে। এই ধরনের কৌশলের লক্ষ্য দ্রুত সামরিক বিজয় নয়, বরং যুদ্ধকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক ব্যয়, সামরিক চাপ এবং রাজনৈতিক মূল্য ক্রমে বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে এই চাপ বজায় রাখতে পারলে সামরিকভাবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষও একসময় কূটনৈতিক সমাধান বা সমঝোতার পথ খুঁজতে শুরু করে।
সম্প্রতি বাব আল-মান্দেবে হুতিদের হামলা বৃদ্ধি এবং হরমুজে ইরানের চাপ– এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একদিকে তাদের জ্বালানি রপ্তানি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা হুমকির মুখে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্র দেশগুলোকে বড় দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব একযোগে অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে এর প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর।
খন্দকার মো. মাহফুজুল হক:
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক