ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

সালমান শাহ হত্যা মামলা

কারাগারে খল অভিনেতা ডন

কারাগারে খল অভিনেতা ডন
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৩২ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ২৩:২০

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। আজ রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।  

এর আগে, আজ সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। তিনি সালমান শাহ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। বিকেলে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত ডনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিমানবন্দর এলাকা থেকে ইমিগ্রেশন পুলিশ ডনকে আটক করে। পরে সিআইডির একটি দল এসে তাকে নিয়ে যায়। সালমান শাহ হত্যা মামলাটি সিআইডিতে তদন্তাধীন রয়েছে।

আদালতে সিআইডির আবেদনে বলা হয়, ডনসহ অন্য আসামিরা পরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করেছে বলে বাদী এজাহারে বলেছে। মামলার তদন্ত চলছে। এ আসামি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। ডনকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী তাকে কারাগারে আটক রাখার বিষয়ে শুনানি করেন। তবে ডনের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

এর আগে, বিকেল পৌনে ৩ টার দিকে ডনকে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে রাখা হয় ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায়। বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেট, হাতকড়া পরিয়ে বিকেল ৫টার দিকে এজলাসে তোলা হয় ডনকে। কাঠগড়ায় নেওয়ার পর জ্যাকেট, হেলমেট, হাতকড়া খুলে দেওয়া হয়। কালো রঙের ছাপা শার্ট, জিন্স প্যান্ট, হলুদ জুতা পরা ডন কাঠগড়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন।

বিচারক জুয়েল রানা ৫টা ৮ মিনিটের দিকে এজলাসে ওঠেন। জানতে চান, আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী আছেন কি না? প্রসিকিউশন বিভাগ থেকে জানানো হয়, আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী নেই। 

এরপর প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আসামিকে কারাগারে আটক রাখার যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এটা আলোচিত মামলা। দীর্ঘদিন পর একটা পর্যায়ে এসেছে। আজ (রোববার) ভোরে বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছিলেন এ আসামি। ইমিগ্রেশন থেকে তাকে আটক করে সিআইডি পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। পরে পুলিশ তাকে আদালতে তোলে।’ 

সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর ২৯ বছর পর এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় হত্যা মামলা করা হয়। এদিন সালমানের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় তাঁর মায়ের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন আদালত। মামলার পরপরই আসামিরা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, সে জন্য ইমিগ্রেশনে আসামিদের একটি তালিকা পাঠায় পুলিশ। সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে হত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত শুরুর পর ডন গ্রেপ্তার হলেন।

ডন গ্রেপ্তারের পর সমকালকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। তিনি বলেন, সালমান আমার বুকের মধ্যে আছে, থাকবে। তাকে হত্যা করা হয়েছে। আর সালমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল এই ডন। শুধু তাই নয়, সালমানের মৃত্যুর পর সে আমাকে নানাভাবে অপমান করেছে এবং আমার ছেলের নামে অনেক মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। সব প্রমাণ একদিন হবে। আশা করি, সন্তান হত্যার বিচার একদিন পাবো।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসা থেকে চিত্রনায়ক সালমান শাহর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘ফাঁসের দরুণ ঝুলে শ্বাসরোধ হয়েছে, যা আত্মহত্যাজনিত।’

ওই ঘটনায় সালমান শাহর বাবা প্রয়াত কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটি হত্যামামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন করেন তিনি। অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। এ ঘটনায় রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ নামে এক আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে সালমানকে কীভাবে হত্যা করা হয়, তা উঠে আসে। তারপরও তদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার বিষয়টি আসেনি। 

তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। তাতে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। 

ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন। তবে সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন সালমান শাহর বাবা। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মহানগর হাকিম আদালত। তাতেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়। সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা মামলাটি চালিয়ে যান।

২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। তিনি পুত্রবধূ সামিরা হক, চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বিউটিশিয়ান রাবেয়া সুলতানা রুবিসহ ১১ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন। পরে মামলাটি তদন্ত করে র‌্যাব। রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ৬–এর বিচারক র‌্যাবকে মামলাটি তদন্ত না করার আদেশ দেন। আদালতের নির্দেশে ওই বছরের ডিসেম্বর থেকে মামলাটির পুনঃতদন্ত শুরু করে পিবিআই। 

তিন বছরের বেশি সময় তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই জানায়, হত্যার প্রমাণ মেলেনি, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। সালমান শাহর লেখা একটি সুইসাইড নোট পাওয়ার কথাও জানায় পিবিআই।

এর আগেও দুই দফা তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ই বলা হয়েছিল। তবে স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এতে একমত হতে পারেননি। 

পিবিআইয়ের তদন্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেন সালমানের পরিবারের সদস্যরা। ছেলের মৃত্যুর কারণ জানতে আরও তদন্ত চান নীলা চৌধুরী। ২০২২ সালের ১২ জুন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত তাঁর রিভিশন আবেদন গ্রহণ করেন। তবে বিভিন্ন কারণে মাঝের কয়েক বছর রিভিশন শুনানি হয়নি। সম্প্রতি রিভিশন আবেদনের শুনানি শুরু হয়, যা শেষ হয় ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর। সেদিনই আদেশের জন্য একই বছরের ২০ অক্টোবর দিন ঠিক করেন আদালত। আর ওইদিনই আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন সালমানের মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ ফরহাদ। 

মামলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নীলা চৌধুরী, বোনের স্বামী কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রোডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু হয়েছে বলে জানান। দ্রুত বাসায় ফিরে তারা সালমানকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগে বলা হয়, তখন কয়েকজন নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।

মামলায় আরও বলা হয়, ছেলের মৃত্যুর আগে থেকেই এটিকে হত্যা বলে সন্দেহ করেছিলেন সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। এ কারণে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন।

আরও পড়ুন

×