ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

সমাজ

গণঅভ্যুত্থানের পরে যে বাংলাদেশ আশা করেছিলাম

গণঅভ্যুত্থানের পরে যে বাংলাদেশ আশা করেছিলাম
×

আনুশেহ আনাদিল

আনুশেহ আনাদিল

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আমাদের অনেকের মনেই আশার সঞ্চার হয়েছিল। আমি আশা করেছিলাম, এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক মুহূর্তটি নতুন একটি প্রজন্মের সামনে বাংলাদেশ গড়ার কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে। শুধু এক দল মানুষের জায়গায় আরেক দল মানুষকে বসানোর জন্য নয়, বরং আমরা আসলে কেমন দেশ গড়তে চাই, সেই প্রশ্নটি নতুন করে ভাবার জন্য।

আর সম্ভবত সবকিছুর ঊর্ধ্বে এমন দেশের আশা করেছিলাম, যে বাংলাদেশ ভিন্নতাকে আরও বেশি সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করবে। আমি আশা করেছিলাম, আমরা অন্যের ওপর একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসব্যবস্থা, একটি মতাদর্শ, ধর্মের একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা কিংবা একটি নির্দিষ্ট জীবনধারা চাপিয়ে না দিতে শিখব। কারণ একই ধর্মের অনুসারী হয়েও মানুষ একইভাবে ধর্মকে বোঝে না।

দুজন মুসলমান ইসলামকে দুইভাবে বুঝতে পারেন। দুজন হিন্দু হিন্দু ধর্মকে দুইভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। দুজন বৌদ্ধ, দুজন খ্রিষ্টান কিংবা যে কোনো আধ্যাত্মিক বা দার্শনিক ধারার দুজন মানুষ নিজেদের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। আবার কেউ কোনো ধর্ম অনুসরণ না-ও করতে পারেন। তাহলে আমরা কেন প্রত্যাশা করব যে, সবাইকে একই রকম হতে হবে?
মানুষ স্বভাবতই ভিন্ন। আমাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন, ইতিহাস ভিন্ন, স্বভাব ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, বিশ্বাস ভিন্ন। অস্তিত্বকে বোঝার পথও ভিন্ন। আমার কাছে বৈচিত্র্য বলতে শুধু অরণ্যের জীববৈচিত্র্য বোঝায় না। বৈচিত্র্য মানে মানুষের বৈচিত্র্যও।

যখন আমরা সবাইকে একইভাবে ভাবতে, একইভাবে বিশ্বাস করতে, একইভাবে পোশাক পরতে, একইভাবে উপাসনা করতে এবং একইভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য করতে চাই, তখন আমরা এক ধরনের মানবিক একফসলি সংস্কৃতি– একটি ‘হিউম্যান মনোকালচার’ তৈরি করি।

একটি সুস্থ অরণ্য শুধু এক প্রজাতির গাছ দিয়ে তৈরি হয় না। তেমনি একটি সুস্থ সমাজও শুধু এক ধরনের মানুষ দিয়ে তৈরি হয় না। সম্ভবত প্রকৃতি আমাদের যে গভীরতম শিক্ষাগুলো দিতে পারে, এটি তার একটি।
আমরা এমন একটি দেশের আশা করেছিলাম, যে দেশ হবে আরও সহনশীল, আরও বিনয়ী, প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে আরও সচেতন, আরও স্বাধীন এবং নিজের ভেতরে থাকা জ্ঞান ও সম্পদের ভিত্তিতে নিজেকে গড়ে তুলতে আরও সক্ষম।

আরও আত্মনির্ভরশীল একটি বাংলাদেশ আমরা আশা করেছিলাম। যে দেশ আরও স্বাধীন হবে এবং ধীরে ধীরে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাবে। বৈদেশিক অর্থায়ন আমাদের অবকাঠামো ও উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে; আর ঋণ নেওয়া নিজের কোনো ব্যর্থতার লক্ষণ নয়। আধুনিক পৃথিবীতে কোনো দেশই সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে টিকে থাকে না। তারপরও আমাদের একটি বাস্তব প্রশ্ন করা উচিত: বাংলাদেশ কীভাবে ধীরে ধীরে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজের ভেতরের সম্পদ ও সক্ষমতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে?

আত্মনির্ভরশীলতা শুধু অর্থের বিষয় নয়। এটি জ্ঞানেরও বিষয়। দায়িত্বশীলতারও বিষয়; মাটি, পানি, জলবায়ু ও ঋতুচক্রের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া বহু প্রজন্মের কৃষিজ্ঞানের প্রতি দায়িত্বশীলতা। দায়িত্বশীল আচরণ যখন একটি কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজ হয়ে ওঠে, তখনই পরিবেশ সচেতনতা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়। আমাদের নদীগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নদীদূষণ না করার দায়িত্ব নাগরিকদের রয়েছে। কিন্তু সরকার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব রয়েছে। বস্তুত উন্নয়নকে জানতে হবে কোথায় থামতে হয়।

নতুন প্রজন্মকে নতুন রাজনৈতিক ভাষাও আনতে হবে। আমরা অনেকেই আশা করেছিলাম, রাজনীতিতে আসা তরুণেরা একটি ভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে আসবেন। কিন্তু কখনও কখনও আমি শুনি, তরুণ রাজনৈতিক কণ্ঠগুলোও আশ্চর্যজনকভাবে সেই পুরোনো প্রজন্মের মতো শোনাতে শুরু করেছে, যাদের পরিবর্তে তাদের আসার কথা ছিল– মতাদর্শে নয়, অন্তত কথা বলার ভঙ্গিতে।
সেই আগ্রাসন। সেই নিজের সত্য সম্পর্কে নিরঙ্কুশ নিশ্চয়তা। সেই ব্যক্তিগত আক্রমণ। প্রতিপক্ষকে পরাস্ত ও অপমান করার সেই তাড়না। মুখ বদলে গেল, কিন্তু ক্ষমতার ভাষা যদি একই থেকে যায়, তাহলে আসলে কতটুকু বদল হলো? 

আর এটি শুধু রাজনীতিবিদদের বিষয় নয়। রাজনৈতিক ভাষ্যকার, জনসভা, সংসদ, সংবাদ সম্মেলন,  সামাজিক মাধ্যম, টক শো, সাক্ষাৎকার– সর্বত্র। আমাদের একটি ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষা প্রয়োজন। 
সংসদে আমাদের প্রতিনিধিদের তীব্রভাবে দ্বিমত করার ক্ষমতা থাকতে হবে, কিন্তু একে অপরকে অপমান না করে। জনসভায় রাজনীতিবিদদের মনে রাখতে হবে– যারা তাদের ভোট দেননি, তারাও বাংলাদেশের নাগরিক। রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের একটি ধারণার সমালোচনা করতে পারা উচিত, সেই ধারণায় বিশ্বাসী মানুষটিকে শত্রুতে পরিণত না করে। 

বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষকে আমার মতোই ভাবতে হবে– এই ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি গোষ্ঠী যদি মনে করে, তাদের কাজ হলো অন্য সবাইকে নিজেদের মতাদর্শের ছাঁচে ঢেলে দেওয়া, তাহলে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না।

আমরা আমাদের বিশ্বাসের পক্ষে যুক্তি দিতে পারি। আমরা সংগঠিত হতে পারি। অন্যকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারি। আমরা কোনো ধারণার কঠোর সমালোচনাও করতে পারি। কিন্তু শুধু আমরা নিজেদের সঠিক মনে করি বলে অন্য মানুষের ওপর আমাদের মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

একসঙ্গে বসবাসের চ্যালেঞ্জ সবাইকে এক রকম বানানো নয়। চ্যালেঞ্জ হলো ভিন্ন থেকেও একসঙ্গে বাঁচতে শেখা। তার জন্য প্রয়োজন বিনয়। আমরা কীভাবে জীবনযাপন করি, ক্ষমতা ব্যবহার করি, সম্পদ বহন করি এবং আমাদের চেয়ে কম সুযোগ পাওয়া মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করি– সেখানেও বিনয় থাকতে হবে। অর্থ নিজে লজ্জার কিছু নয়। অনেক মানুষ পরিশ্রম, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে সততার সঙ্গে সম্পদ অর্জন করেছেন। কিন্তু শুধু সম্পদ কাউকে অধিক সম্মানের যোগ্য করে তোলে না। আর দারিদ্র্য কোনো মানুষকে কম সম্মানের যোগ্য করে না।
আমি আশা করেছিলাম, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা বাংলাদেশ এমন একটি দেশ হবে, যেখানে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং একই ধর্মের ভেতরের প্রতিটি ভিন্ন ধারা নিরাপদ বোধ করবে এবং সমানভাবে অনুভব করবে– এই দেশ তাদেরও। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, এই উদ্বেগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে; এমনকি আহমদিয়া মুসলমান এবং তাদের উপাসনালয় আক্রান্ত হয়েছে। সুফি মাজার, পীরদের সঙ্গে সম্পর্কিত পবিত্র স্থান এবং সুফি ঐতিহ্যের ওপরেও বারবার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো সদস্যের ওপর সংঘটিত প্রতিটি হামলা শুধু ধর্মীয় কারণে নাও হতে পারে। কিন্তু ঘটনার জটিলতাকে অস্বীকারের অজুহাত বানানো যাবে না।

আক্রান্ত ব্যক্তি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আহমদিয়া, আদিবাসী, সুফি ভক্ত, পীর অথবা নিজের পরিচয়, বিশ্বাস বা ধর্মীয় চর্চার কারণে আক্রান্ত অন্য যিনিই হোন না কেন; নীতিটি একই হওয়া উচিত: রাষ্ট্রকে তাদের সুরক্ষা দিতে হবে; হামলার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করতে হবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
কোন ধর্ম গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়– সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কোনো জনতা বা উন্মত্ত গোষ্ঠীর নেই। অন্য কোনো সম্প্রদায়ের মন্দির, গির্জা, বিহার, মসজিদ, মাজার বা পবিত্র স্থান ধ্বংস করার অধিকার কোনো গোষ্ঠীর নেই। বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, অন্য বিশ্বাসের মানুষ এবং কোনো ধর্মে বিশ্বাস না করা মানুষের– সবার।
বাংলাদেশ আমাদের সবার। আর ‘আমাদের সবাই’ বলতে শুধু মানুষকে বোঝাচ্ছি না।

আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন

×