সরকারি পুকুর ভরাট
প্রশাসনের উদাসীনতা ক্ষমার অযোগ্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বরিশাল নগরীতে একটি সরকারি পুকুর অবৈধভাবে ভরাট ও দখলের যে অভিযোগ উঠিয়াছে তাহা স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত আমলে লওয়া উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। শুক্রবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বলিতেছে, পুকুরটির আয়তন প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং নগরীর ভাটিখানা এলাকায় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও সদ্যনির্মিত শিশু হাসপাতালের পার্শ্বে অবস্থিত। সরকারি দলের স্থানীয় প্রভাবশালী কতিপয় নেতার সহযোগিতায় ভূমিদস্যুচক্র জাল কাগজপত্র তৈরি করিয়া অত্র মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্রাস করিতে তৎপর। তবে দুর্ভাগ্যজনক, দখলদার চক্র দীর্ঘ ২০ দিন ধরিয়া রাত্রে উক্ত পুকুরে বালি ফেলিয়া ভরাটকার্য চালাইলেও স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি অফিস কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ হইতে কোনো ফলপ্রসূ প্রতিকার বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে স্থানীয় থানাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলিতে অভিযোগ জানাইবার পরও প্রশাসনের ভূমিকা নীরব দর্শকের ন্যায়। এই প্রেক্ষাপটে কেহ উক্ত দুষ্কর্মে স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কোনো প্রকার যোগসাজশ আবিষ্কার করিলে তাহাকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবে না। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বা যে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও অব্যবস্থাপনার যে হতাশাজনক বাস্তবতা বিরাজমান, আলোচ্য ঘটনায় বিস্ময়ের কিছু নাই।
পরিবেশ সুরক্ষা ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার প্রয়োজনে নগর এলাকায় পুকুরের গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করিয়া হাসপাতাল-সংলগ্ন এলাকায় পুকুর বা জলাশয় সংরক্ষিত থাকা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং অতিজরুরি মুহূর্তে পানি সরবরাহের জন্য অপরিহার্য। অথচ কতিপয় অসাধু ব্যক্তি ব্যক্তিগত ভুয়া দলিলের অজুহাত তুলিয়া এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া ব্যবহার করিয়া এমন মূল্যবান পরিবেশগত সম্পদ বিনাশ করিতেছে। সর্বোপরি, বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ অনুযায়ী যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি জলাশয়, পুকুর, খাল বা নদী ভরাট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আদালত বা ট্রাইব্যুনালে মামলার দীর্ঘসূত্রতার অজুহাত দিয়া স্বীয় দায়িত্বকে উপেক্ষা করিতে পারেন না। তাৎক্ষণিক অবৈধ ভরাট বন্ধ, ভরাটকৃত বালি অপসারণপূর্বক পুকুরটিকে পূর্বাবস্থায় ফিরাইয়া আনা এবং জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রশাসনের আইনি ও নৈতিক কর্তব্য। মনে রাখিতে হইবে, কোনো একটি নগরে খাসজমি ও সরকারি পুকুর বেদখল হওয়া নিছক কোনো অপরাধমূলক ঘটনা নহে। বরং উহা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনেরও শামিল।
রাষ্ট্রীয় সম্পদ হইল সমষ্টিগতভাবে জনগণের সম্পদ; ইহার সুরক্ষা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার নির্ধারিত দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অবহেলাও অপরাধের সমতুল্য।
আমরা জানি, এহেন পরিস্থিতি কেবল বরিশাল নহে, সমগ্র দেশেই ঘটিয়া চলিয়াছে। দেশের বিভিন্ন নগর ও গ্রামাঞ্চলে প্রতিনিয়ত অসংখ্য পুকুর, দিঘি ও জলাশয় দখল করিয়া আবাসন ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হইতেছে। ইহার ফলে দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত বিপর্যয় ত্বরান্বিত হইতেছে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও ক্রমশ হ্রাস পাইতেছে। তবে এহেন ঘটনা এমন সময়ে ঘটিতেছে যখন সরকারি খাসজমি, পুকুর ও জলাশয় রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ একটা সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন। সেই অঙ্গীকার পালনে রাষ্ট্রীয়ভাবে তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলেরও পক্ষ হইতে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে।
মোদ্দা কথা, বরিশালের এই ঘটনাকে সরকার ও দল উভয়কেই গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করিতে হইবে। অবিলম্বে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল-সংলগ্ন পুকুরটির অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদ এবং বালি অপসারণ করিয়া পুকুরটি পুনরুদ্ধার করিতে হইবে। তৎসহিত যাহারা জালিয়াতির মাধ্যমে খাসজমি দখলের ষড়যন্ত্র করিয়াছে এবং যাহারা এই অপরাধে নীরব সমর্থন বা মদদ দিয়াছে তাহাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করিয়া দৃশ্যমান শাস্তির আওতায় আনিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়