ঢাকা রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

জনসংস্কৃতি

আদিবাসী দিবস এবং লোকজ জ্ঞানের গুরুত্ব

আদিবাসী দিবস এবং লোকজ জ্ঞানের গুরুত্ব
×

ঈশিতা দস্তিদার

ঈশিতা দস্তিদার

প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

এ বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের স্লোগান ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মানিত করার মাধ্যমে জীবন ও কল্যাণ রক্ষা’ করা। অর্থাৎ আমাদের লোকায়ত জ্ঞান, যা এখনও আমাদের আদিবাসী সমাজ ধারণ ও চর্চা করে চলেছে, তার গুরুত্ব তুলে ধরা। প্রশ্ন হতে পারে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা কতটুকু জরুরি? 

বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলের অর্ধশতাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও স্থানীয় দাই বা ধাত্রীরা গর্ভধারণ, প্রসব ও প্রসব-পরবর্তী যত্নে ভূমিকা রাখেন। তাদের প্রাকৃতিক জ্ঞান, খাদ্যাভ্যাস রুটিন, মানসিক সহযোগিতার ধরন, মা ও নবজাতকের সুস্থতা নিশ্চিত করার প্রথাগত জ্ঞানের গুরুত্ব রয়েছে। তারা জানেন, কোন গাছের পাতা প্রসব ব্যথায় কাজ করে। কোন ঝর্ণার পানি প্রসবের পর খাওয়ালে ভালো হয়; কোন জঙ্গলের কোন ঔষধি লতায় নাড়ি শুকোবে ইত্যাদি তাদের জানা। এগুলো স্থানীয় প্রতিবেশ থেকে আসে। এতে রাসায়নিক সার বা কীটনাশক লাগে না। এসবের পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বার গান-গল্প, নামকরণের উৎসব, মুখেভাত অনুষ্ঠান সমাজকে ধরে রাখতে জানে। অনেক আদিবাসী সমাজ বিশ্বাস করে, শিশু জন্মের সময় যে গাছের নিচে নাড়ি পোঁতা হয়, সেই গাছটা তার ‘জীবন গাছ’। বড় হয়ে সে গাছটার যত্ন নেবে। এটা সামাজিক সাংস্কৃতিক আচার থেকেও বেশি কিছু বলে আমাদের। এভাবেই যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রাণ ও প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য করে বসবাস করে আসছে। 

আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা আসার ফলে স্থানীয় দাইদের কাজকে অবৈজ্ঞানিক ট্যাগ দিয়ে বাদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। সে কারণেই আদিবাসী সমাজের ধাত্রীবিদ্যার ডকুমেন্টেশন দরকার। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর দু-তিনজন বয়স্ক দাইয়ের নিবিড় সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে আদিবাসীদের চিকিৎসা ব্যবস্থার একটা ডিজিটাল আর্কাইভ করা যেতে পারে। পাশাপাশি দরকার আধুনিক প্রশিক্ষণ, যাতে তাদের লোকজ বিদ্যার সঙ্গে আধুনিক ধাত্রীসেবার সমন্বয় ঘটানো যায়। কিন্তু রাষ্ট্র কি আদিবাসী জ্ঞানকে ‘পরিপূরক স্বাস্থ্যসেবা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে? সে রকম হলে আমরা হয়তো রাষ্ট্রের নতুন কল্যাণময় রূপও দেখতে পেতাম।

বাংলাদেশের আদিবাসী সমাজের পুরোনো চাওয়া জাতিগত মর্যাদা ও পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, ঐতিহ্যগত ভূমি ও বনজ সম্পদের ওপর অধিকার নিশ্চিত করা, ভূমি দখল বন্ধ করা, স্থানীয় ও জাতীয় শাসন ব্যবস্থায় কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ ইত্যাদি। গণঅভ্যুত্থানের পর কিছু নীতিগত অগ্রগতি ও উল্লিখিত দাবির পক্ষে নাগরিক সমাজের সংহতি ও সমর্থন বেড়েছে। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের পূর্ণ স্বীকৃতি নিয়ে এখনও বিতর্ক চলমান। ভূমি বিরোধ ও উচ্ছেদের শঙ্কাও অব্যাহত। আর তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বরাবরই তুলনামূলক সীমিত। সামাজিক বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতাও দূর হয়নি। 

প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জ থেকে নেত্রকোনা পর্যন্ত একনেক অনুমোদিত আন্তঃজেলা সীমান্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে যেসব আদিবাসী পরিবারের জায়গা অধিগ্রহণ হয়েছে, তারা অনেকে এখনও ক্ষতিপূরণের জন্য অপেক্ষা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যেসব খাসি পুঞ্জিতে বিগত সরকারের আমল থেকে গত সপ্তাহ অব্দি ধারাবাহিকভাবে পানগাছ কাটা, ধ্বংস ও দখলের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোরও কোনো সুরাহা হয়নি। কুয়াকাটায় পায়রা বন্দরের জন্য ২০২১ সালে উচ্ছেদ হয় ছ-আনি পাড়ার ছয়টি রাখাইন পরিবার। গাছপালা ও অন্যান্য সম্পদের জন্য ৯৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও দীর্ঘ পাঁচ বছরেও প্রতিশ্রুত স্থায়ী ঘরের ব্যবস্থা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব আদিবাসী হত্যা এবং হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, তারা বা তাদের স্বজনরা ন্যায়বিচার পাননি। বিনা বিচারে কারাবন্দিত্বের ৮৪২ দিন পার হলেও বেথেলপাড়ার সাধারণ বমদের এখনও মুক্তি মেলেনি। এর মধ্যে কারাবন্দি অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন তিনজন। আরও কয়েকজন বম ক্যান্সারসহ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত। 

আদিবাসী জ্ঞান সব সময় মানুষ, ভূমি, প্রকৃতি ও আত্মাকে অবিচ্ছেদ্য মনে করে। আদিবাসী সমাজ আগে স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনে ৩০-৪০ রকম গাছ-লতা ব্যবহার করত। এসব গাছ জুমের পাশে, পাহাড়ের ঢালে, নদীর পারে আপনাতেই জন্মাত। উন্নয়নের ডামাডোলে বনাঞ্চল ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্যের বিনাশ এই সমাজের মাতৃস্বাস্থ্য ও নবজাতকের পাশাপাশি পুরো জনগোষ্ঠীর জীবনকে সংকটময় করে তুলেছে। জমি যদি যখন তখন রিসোর্ট, ইকোপার্ক, ইউক্যালিপটাস বা আমবাগান ও রক্ষীদের ক্যাম্প হয়ে যায়; সব সময় উচ্ছেদ আতঙ্কে জীবনযাপন করতে হয়, তখন বনজ লোকায়ত জ্ঞান নিয়ে আলাপের কী বাকি থাকে? 
প্রশ্ন জাগে; এবারের আদিবাসী দিবসের স্লোগানকে আমরা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেব? 

অথচ আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির তাঁত, নকশা, গান, খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসা– এই সব কিছুর ভেতরে আদিবাসী জ্ঞানের গভীর ছাপ আছে। প্রতিটি আদিবাসী ভাষা ও উৎসবকে জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করা আমাদের বৃহত্তর সমাজের জন্যই ইতিবাচক হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমি সংকট, ভাষার বিলুপ্তির সংকটে পার্বত্যাঞ্চল ও সমতলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস করা যাবে না। সমতলে আদিবাসীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। আদিবাসীদের জ্ঞান– জৈব কৃষি, বন সংরক্ষণ, ঐতিহ্যবাহী ওষুধ; জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আমাদের সম্পদ। যে কোনো অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ব্যতীত তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার অবান্তর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উদ্যোগ থেকে বিরত থাকতে হবে।

একটি শক্তিশালী জাতি গড়ে ওঠে তার বৈচিত্র্যকে ধারণ করার মধ্য দিয়ে। পাহাড় আর সমতল, আদিবাসী আর বাঙালি মিলেই বাংলাদেশ। ফলে আদিবাসী জনগণের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও উন্নয়ন’ নিছক স্লোগান নয়; রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও বৈচিত্র্যময় নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশায় এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস সফল হোক। 

ঈশিতা দস্তিদার: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক
 

আরও পড়ুন

×