এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ
শিল্পী এস এম সুলতান। ফাইল ছবি
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ০০:২০
বাংলার কৃষককে সাধারণত দেখা যায়, মাটির কাছাকাছি এক পরিশ্রান্ত মানুষ হিসেবে। রোদে পোড়া শরীর, শ্রমে ক্ষয়ে যাওয়া পেশি, জীবিকার অনিশ্চয়তা। গ্রামীণ বাস্তবতার এই চেনা ছবিই যেন কৃষকের প্রতিচ্ছবি। এস এম সুলতান সেই চেনা প্রতিচ্ছবিটিই বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর ক্যানভাসে কৃষক দুর্বল বা পরাজিত নন। বিশালদেহী, পেশিবহুল, দৃঢ় ও প্রাণময়। বাস্তবের ক্ষীণকায় কৃষকের শরীরে যে শক্তি প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়, সুলতান যেন সেটিকেই দৃশ্যমান করে তুলেছিলেন। এ কারণেই তাঁর শিল্পকর্মে কৃষক শুধু একটি চরিত্র নয়, হয়ে উঠেছে শ্রম, মাটি ও মানুষের অস্তিত্বের প্রতীক। লাঙল হাতে জমিতে নামা মানুষটির শরীরে তিনি দেখেছেন, সভ্যতার অন্যতম নির্মাতাকে। তাঁর ছবিতে তাই গ্রাম নিছক পটভূমি নয়। আর কৃষকও নিছক দৃশ্যের অংশ নন। মানুষ ও মাটির সম্পর্কই সেখানে শিল্পের প্রধান বিষয়।
আজ ১০ আগস্ট শিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২৩ সালের এই দিনে নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম নেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান। শৈশবে পরিবারের মানুষ তাঁকে ‘লাল মিয়া’ নামে ডাকতেন। বাবা শেখ মেছের আলী ছিলেন রাজমিস্ত্রি। বাবার সঙ্গে নির্মাণকাজে যেতে যেতে ছোটবেলায় ভবন, মানুষের শরীর ও শ্রমের দৃশ্য আঁকার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পাঁচ বছর পড়াশোনার পর তিনি বাবার কাজে যুক্ত হন।
শিল্পশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় নিয়ে যায়। স্থানীয় জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের আর্থিক সহায়তায় সেখানে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও শিল্পসমালোচক শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে পড়ার সুযোগ পান। তবে তিন বছর পর সেই শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই বেরিয়ে আসেন। শুরু হয় তাঁর স্বাধীনভাবে শিল্পচর্চা ও ভ্রমণের জীবন।
১৯৪৬ সালে সিমলায় তাঁর প্রথম প্রদর্শনী হয়। দেশভাগের পর কিছুদিন কাশ্মীরে থেকেছেন। ১৯৫১ সালে যান করাচিতে এবং সেখানে একটি স্কুলে শিল্পশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এর আগে ১৯৫০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো ও বস্টনে তাঁর কাজ প্রদর্শন করেন। পরে লন্ডনেও তাঁর ছবি প্রদর্শিত হয়।
বিশ্বশিল্পের সেই বিস্তৃত পরিসর শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিজের মাটি থেকে দূরে সরাতে পারেনি। ১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে এসে চিত্রা নদীর তীরের জীবনকেই নিজের শিল্প ও অস্তিত্বের কেন্দ্র করে নেন। শিশুদের জন্য শিক্ষা ও সৃজনশীলতার পরিবেশ তৈরিতেও তিনি উদ্যোগী হন। শেষ জীবনে নড়াইলে ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁর সেই স্বপ্নের কিছুটা বাস্তব রূপ পায়। সুলতানের কৃষক বাস্তবের অনুলিপি নয়। তাঁর শিল্পে তা এক ধরনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার রূপ। তাঁর বিশাল পেশিবহুল কৃষক-চরিত্রকে বাস্তবের ক্ষীণকায় কৃষক-জেলের বিপরীতে প্রতীকী এক স্বপ্নের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। একই সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের শোষণ, সহিংসতা ও বঞ্চনার বাস্তবতাও তাঁর শিল্পে অনুপস্থিত নয়। এই ভাবনার শক্তিশালী উদাহরণ তাঁর আঁকা ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’ (১৯৭৫) ও ‘চরদখল’ (১৯৭৬)। পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজ ‘ফসল কাটা’ (১৯৮৬) এবং ‘Fishing-3’ (১৯৯১) শিল্পকর্মে কৃষক, শ্রম, প্রকৃতি ও জীবনের সম্পর্ক ফিরে এসেছে।
১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী হয়। এর পরই দেশের শিল্পমহলে তাঁর কাজ নতুন করে আলোচনায় আসে। স্বীকৃতিও আসে ধারাবাহিকভাবে-১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার। তবু খ্যাতি তাঁকে শহুরে শিল্পজগতের স্থায়ী বাসিন্দা করে তুলতে পারেনি। নড়াইল, চিত্রা নদী, শিশু, পশুপাখি এবং সাধারণ মানুষকে ঘিরেই থেকেছে তাঁর জীবন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
মৃত্যুর তিন দশক পরও সুলতানের কৃষকেরা ক্যানভাসে কাজ করে চলেছেন। তাঁরা মাটি চাষ করেন, ফসল ফলান, নদীতে নামেন, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেন। তাদের শরীরের অতিরঞ্জিত পেশি আসলে কেবল শারীরিক শক্তির ছবি নয়। সেখানে আছে শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা ও সম্ভাবনার এক শিল্পিত ঘোষণা। সুলতানের ক্যানভাস তাই শুধু বাংলার গ্রামের ছবি নয়। সেখানে মাটি আছে, শ্রম আছে, বঞ্চনা আছে, আবার আছে টিকে থাকার স্বপ্নও। তাঁর কৃষকের শরীর যতটা বড়, তাঁর ভেতরে ধারণ করা স্বপ্নটিও যেন ততটাই বিস্তৃত- মানুষের নিজের শক্তিতে নিজের পৃথিবী নির্মাণের স্বপ্ন।
- বিষয় :
- চিত্রশিল্পী
- জন্মবার্ষিকী