মায়ের দুধ খাওয়ানো কমেছে, ইউনিসেফ-ডব্লিউএইচওর উদ্বেগ
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ | ২০:০৮
দেশে শিশুদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার কমে গেছে। ২০১৯ সালে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু মায়ের দুধ খাওয়ার হার ছিল ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশে। একই সময়ে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। একই সঙ্গে মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগগুলো আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ এবং বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. জামশেদ মোহাম্মদ যৌথ বিবৃতিটি দেন। বিবৃতিতে বলা হয়, জন্মের পর প্রথম ছয় মাসে শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি মায়ের দুধ থেকেই পাওয়া যায়। মায়ের দুধ শিশুকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা করে। মায়ের জন্যও এর উপকার রয়েছে। এতে স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।
ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও বলেছে, মায়ের দুধ খাওয়ানো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও সব মায়ের জন্য এটি সহজ নয়। গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মের সময় ও পরে অনেক মা প্রয়োজনীয় পরামর্শ, উৎসাহ ও সহায়তা পান না। পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা না থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর উপযোগী পরিবেশের অভাবও বড় বাধা।
বিবৃতিতে বলা হয়, পরিবারগুলোর সামনে এখনো মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচার-প্রচারণা চলছে। জরুরি ও মানবিক সংকটের সময় এসব বাধা আরও প্রকট হয়।
এবারের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’। এ বিষয়ে নতুন কোনো সমাধান খোঁজার চেয়ে ইতিমধ্যে কার্যকর প্রমাণিত উদ্যোগগুলো আরও বিস্তৃত ও টেকসই করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দুই সংস্থা।
ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচওর মতে, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তা, শিশু-বান্ধব হাসপাতাল কর্মসূচি, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা এবং স্তন্যদানের উপযোগী কর্মপরিবেশ মায়ের দুধ খাওয়ানোর হার বাড়াতে কার্যকর। একই সঙ্গে মায়ের দুধের বিকল্প ও শিশুখাদ্যের বিপণন নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, মায়ের দুধ খাওয়ানো সহায়ক কার্যক্রমে প্রতি ১ মার্কিন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ৫৯ ডলার অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় কমা, শিশুদের মেধার বিকাশ, শিক্ষায় ভালো ফল এবং ভবিষ্যতে বেশি আয় করার সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে এ সুফল আসে।
দুই সংস্থা সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে মায়ের দুধ খাওয়ানো নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ আরও জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রত্যেক স্বাস্থ্যকর্মীর মায়ের দুধ খাওয়ানোকে সুরক্ষা, উৎসাহিত করা ও সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা থাকতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শিশু-বান্ধব হাসপাতাল কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি জবাবদিহি ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
কর্মজীবী মায়েদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি, বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য বিরতি এবং উপযোগী কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৩ সালের মায়ের দুধের বিকল্প, শিশুখাদ্য বিপণন নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুখাদ্যের অনুপযুক্ত প্রচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে মায়ের দুধ খাওয়ানো সংক্রান্ত সহায়তা যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও। বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মায়েরা যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শক্তিশালী উপাত্ত, মনিটরিং ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, শিশুদের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর বিনিয়োগগুলোর একটি হলো মায়ের দুধ খাওয়ানো সুরক্ষা ও উৎসাহিত করা এবং মায়েদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। এটি শিশুর জীবন বাঁচায়, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নতি করে, শেখার সক্ষমতা বাড়ায় এবং ভবিষ্যতে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।
ইউনিসেফ ও ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে তারা কাজ চালিয়ে যাবে। এমন একটি সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য, যেখানে প্রত্যেক মা সফলভাবে সন্তানকে মায়ের দুধ খাওয়াতে পারবেন এবং প্রতিটি শিশু সুস্থভাবে বেড়ে উঠে তার পূর্ণ বিকাশের সুযোগ পাবে।
- বিষয় :
- ইউনিসেফ
- ডব্লিউএইচও
- বিবৃতি