গরমে বছরে নষ্ট ১১৮ কোটি কর্মদিবস
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রচণ্ড গরমে কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়া ও তাপজনিত অসুস্থতার কারণে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১১৮ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের হারানো মজুরি প্রায় ৪১০ কোটি ডলার। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের কারণে কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার ক্ষতি হিসাবের সঙ্গে যোগ করলে বছরে মোট মজুরি ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬২২ কোটি ডলার, যা বর্তমান বিনিময় হারে প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৩৮ শতাংশের সমান।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইআইইডি) ও অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘টু হট টু ওয়ার্ক, টু পুওর টু রেস্ট’ শীর্ষক গবেষণাটি গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশ করা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচণ্ড গরমে ঘরের বাইরে কাজ করা একজন শ্রমিক বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭ কর্মদিবস এবং ঘরের ভেতরে কাজ করা শ্রমিক ১৩ দশমিক পাঁচ কর্মদিবস হারান। বাইরে কাজ করা শ্রমিক বছরে গড়ে ১৪৮ দশমিক ৯ ডলার এবং ভেতরে কাজ করা শ্রমিক ৮৯ দশমিক ১ ডলার মজুরি হারান।
গবেষণার জন্য ঢাকার ১৭৫টি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে ১২২টি পরিবার নির্মাণ, সড়কের কাজ ও রিকশা চালানোর মতো বাইরের কাজে এবং ৫৩টি পরিবার পোশাকশিল্পের মতো ঘরের ভেতরের কাজে যুক্ত। জরিপের পাশাপাশি শ্রমিকদের কাজ ও বিশ্রামের সময় পর্যবেক্ষণ, দলীয় আলোচনা, সাক্ষাৎকার ও পারিবারিক কেস স্টাডি করা হয়। স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ফলাফল তিন চিকিৎসকের একটি প্যানেল পর্যালোচনা করে।
বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে। এসব শ্রমিকের আয় মূলত কাজের উপস্থিতি ও উৎপাদনক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে অতিরিক্ত গরমে কাজ বন্ধ রাখা, কর্মঘণ্টা কমানো কিংবা কাজের গতি কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে তাদের আয়ে। আইআইইডির জলবায়ু সহনশীলতা, অর্থায়ন ও ক্ষয়ক্ষতি বিভাগের পরিচালক ঋতু ভরদ্বাজ বলেন, গরমে শ্রমিকের কাজের গতি কমে গেলে ক্ষতিটি তাঁকেই নীরবে বহন করতে হয়। তারা আয় হারান, সঞ্চয় ভাঙেন কিংবা ঋণ নেন। কিন্তু এসব ক্ষতির কোনো হিসাব রাখা হয় না, ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয় না।
তাপের ঝুঁকি শুধু কর্মস্থলেই সীমাবদ্ধ নয়। জরিপে অংশ নেওয়া ২৩ দশমিক ১ শতাংশ শ্রমিক কিডনির সমস্যার কথা জানিয়েছেন। গবেষকদের অনুমান, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত তাপের মধ্যে কাজ করলে মোট শ্রমিকের প্রায় ৬ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। আবার হিটস্ট্রোকের অভিজ্ঞতা থাকা প্রতি ২০ জন শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১৯ জনই চিকিৎসা নেননি।
গবেষকদের হিসাবে, তাপপ্রবাহে অসুস্থতা ও উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে দেশে বছরে প্রায় ১১৮ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়। এতে হারানো মজুরি প্রায় ৪১০ কোটি ডলার, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের কারণে কর্মক্ষমতা কমার ক্ষতি যোগ করলে হারানো মজুরি বেড়ে ৬২২ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। বর্তমান বিনিময় হারে এর পরিমাণ প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
গবেষণাটি বলছে, তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ওপর পড়ছে। কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ না থাকায় তারা অসুস্থ অবস্থাতেও কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে তাপপ্রবাহ শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য নয়, শ্রমিকের আয়, পরিবার ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।