ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

গাজার পথে সংহতি, প্রতিরোধ ও মানবতার গল্প

গাজার পথে সংহতি, প্রতিরোধ ও মানবতার গল্প
×

ছবি: দ্রোহী তারা

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০২:০১

গাজার উদ্দেশে যাত্রা করা তিন ফ্লোটিলা অ্যাক্টিভিস্টের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও সংহতির গল্প নিয়ে রাজধানীর দৃকপাঠ ভবনে শুরু হয়েছে প্রদর্শনী ‘ফ্লোটিলা: বাংলাদেশ সেইলস ফর গাজা’। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় পান্থপথের দৃকপাঠ ভবনে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়।

দৃক পিকচার লাইব্রেরির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ প্রদর্শনীতে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি অ্যাক্টিভিস্ট জুবায়ের ইসলাম খান ও মোহাম্মদ আলী (লিয়াকত) এবং আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলমের গাজামুখী যাত্রার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। অবরুদ্ধ গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর আরোপিত ইসরায়েলি অবরোধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁরা এ অভিযানে অংশ নেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিন অ্যাক্টিভিস্টের পাশাপাশি বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস. ওয়াই. রমাদান এবং দৃকের জেনারেল ম্যানেজার ও প্রদর্শনীর কিউরেটর এএসএম রেজাউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

প্রদর্শনী সম্পর্কে এএসএম রেজাউর রহমান বলেন, এটি মূলত তিনজনের অভিজ্ঞতার একটি সরল উপস্থাপনা। তাঁরা কীভাবে গাজামুখী অভিযানে যুক্ত হলেন এবং সেই যাত্রায় কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, সেটিই এখানে তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনীর একটি অংশে ইসরায়েলের কেৎজিয়েত কারাগারের একটি শৈল্পিক উপস্থাপনাও রাখা হয়েছে। শিল্পী সোফিয়া করিম তিন অ্যাক্টিভিস্টের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কয়েকটি ঘটনার মডেল নির্মাণ করেছেন, যা প্রদর্শনীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মোহাম্মদ আলী (লিয়াকত) বলেন, গ্যালারিতে প্রদর্শিত ছবিগুলো শুধু তাঁদের যাত্রার স্মারক নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের বাস্তবতারও একটি প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন, যাত্রাপথে তাঁদের আটক করা হয়েছে, হয়রানি ও অপমানের শিকার হতে হয়েছে, এমনকি কয়েকজন আহতও হয়েছেন। তবে তাঁদের এই অভিজ্ঞতা ফিলিস্তিনিদের প্রতিদিনের দুর্ভোগের তুলনায় খুবই সামান্য।

তিনি আরও বলেন, কয়েকজন সহযোদ্ধাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। প্লাস্টিক বুলেটের আঘাতে অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। কিন্তু তাঁদের নিজেদের অভিজ্ঞতার চেয়ে ফিলিস্তিনিদের চলমান মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জুবায়ের ইসলাম খান বলেন, এই মিশন তাঁকে তাঁর মাতৃভূমির সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের পতাকা এবং এর প্রতিনিধিত্ব করা মূল্যবোধ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি আরও গভীর হয়েছে। একজন কৃষকের নাতি হিসেবে তিনি কখনো ভাবেননি যে, তাঁর মতো সাধারণ একজন মানুষও ইতিহাসের অংশ হতে পারেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। ফিলিস্তিনের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশিদের সংহতির শক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অ্যাক্টিভিস্টরা একদিন এই সংগ্রামকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

শহিদুল আলম বলেন, প্রদর্শনীতে দুটি ভিন্ন ফ্লোটিলা অভিযানের অভিজ্ঞতাকে একত্র করা হয়েছে। একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে, অন্যটি চলতি বছরের মে মাসে। দুটি অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে উপস্থাপন করায় দর্শকেরা পুরো ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পাবেন।

তিনি বলেন, অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের কথাও মনে রাখতে হবে। কারণ তাঁরাও এই সময়ে মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছেন।

শহিদুল আলম আরও বলেন, বিশ্বের অনেক সরকার যখন নীরব ছিল, তখন বাংলাদেশের নেতারা তাঁদের অভিযানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি নৌযান নিয়ে আবারও ফ্লোটিলা অভিযানে অংশ নেবেন। বিভিন্ন মানুষের অনুদানে একটি নৌকা কেনা সম্ভব হয়, যা বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে যাত্রা করে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস. ওয়াই. রমাদান বলেন, ফিলিস্তিনের মানুষের প্রতি সংহতি শুধু কথায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; এর জন্য সাহস, ত্যাগ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।

তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিরা উচ্ছেদ, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হলেও তাঁরা নিজেদের সংগ্রাম থেকে সরে আসেননি। স্বাধীনতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের জন্য তাঁদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।

প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে আজ শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় ‘ফ্লোটিলা: বাংলাদেশ সেইলস ফর গাজা’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এতে তিন অ্যাক্টিভিস্ট তাঁদের অভিন্ন অভিজ্ঞতা দর্শকদের সামনে তুলে ধরবেন।

প্রদর্শনীতে আলোকচিত্র, ভিডিও ফুটেজ ও বিভিন্ন আর্কাইভাল উপকরণের মাধ্যমে গাজামুখী যাত্রার বিভিন্ন পর্যায় তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাঁদের নৌযান আটক হওয়ার ঘটনাও স্থান পেয়েছে।

আগামী ২৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

আরও পড়ুন

×