শতভাগ জিপিএ ৫ নিয়ে প্রশ্ন কাদির মোল্লা স্কুলকে শোকজ
ছবি: বিজ্ঞপ্তি থেকে
সমকাল প্রতিবেদক ও নরসিংদী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১২:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় শতভাগ জিপিএ ৫ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮২ জন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ ৫ পেয়েছে। বাকি ২১৯ জন পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা খানের ১৬ আগস্ট সই করা এক অফিস আদেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এতে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত ও নথিপত্রসহ সশরীরে বোর্ডে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। অফিস আদেশে বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত জরুরি’ উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে প্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের তথ্য, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের তালিকা, এসএসসির নির্বাচনী (টেস্ট) পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের তথ্য এবং চূড়ান্তভাবে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণকারী শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পাঠদান, বিভাগ ও অতিরিক্ত শ্রেণি শাখার অনুমতি-সংক্রান্ত নথিও উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে। বোর্ড জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শোকজের জবাব না দিলে অথবা দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৩৮২ জনের সবাই জিপিএ ৫
চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে মোট ৩৮২ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৩৭৬ ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে ছয়জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই জিপিএ ৫ পেয়েছে।
গত বছরও এসএসসিতে প্রতিষ্ঠানটির ৩২০ পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ ৫ পেয়েছিল। ফলে টানা শতভাগ জিপিএ ৫ পাওয়ার সাফল্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রশংসিত হলেও এবার পরীক্ষার্থী সংখ্যা ও নবম শ্রেণির নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যার বড় ব্যবধানকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থী ছিল ৬০১ জন। দুই বছর পর ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৩৮২ জন। অর্থাৎ একসঙ্গে নিবন্ধিত হওয়ার পরও ২১৯ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি।
দুর্বল শিক্ষার্থীদের টেস্টে অকৃতকার্য দেখিয়ে বাদ
অভিভাবক ও কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ, শতভাগ জিপিএ ৫-এর সাফল্য ধরে রাখতে টেস্ট পরীক্ষাকে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তুলনামূলক কম নম্বর পাওয়া বা দুর্বল শিক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখিয়ে এসএসসির ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
কয়েকজন অভিভাবকের দাবি, টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন তুলনামূলক কঠিন করা এবং খাতা কঠোরভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরে তাদের কেউ কেউ অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করেছে।
নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল থেকে চলতি বছর টিসি নিয়ে নরসিংদী সানবীন স্কুলে ভর্তি হয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫০ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ২৫ জনই জিপিএ ৫ পেয়েছে। এ ছাড়া ঘোড়াদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও নরসিংদী মডেল স্কুলসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেও সাবেক এসব শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করেছে বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় অভিযোগ জোরালো হয়েছে বলে মনে করছেন অভিভাবকদের অনেকে। তাদের প্রশ্ন, একটি প্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত ৬০১ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৮২ জনের সবাই জিপিএ ৫ পেলেও বাকি ২১৯ শিক্ষার্থী কেন মূল পরীক্ষায় অংশ নিতে পারল না– এর ব্যাখ্যা কী?
প্রধান শিক্ষকের দাবি, অভিযোগ ‘ভুয়া’
তবে শিক্ষার্থী বাছাই করে শতভাগ জিপিএ ৫ নিশ্চিত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন হোসেন। তিনি সমকালকে জানান, এবারের টেস্ট পরীক্ষায় মোট ৪৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩৮২ জন উত্তীর্ণ এবং ১০১ জন অকৃতকার্য হয়। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদেরই এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, টেস্ট পরীক্ষায় এ প্লাস না পেলে ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয় না– এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নম্বর পেলেই ফরম পূরণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রথম দফার টেস্ট পরীক্ষায় ১১৭ জন শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়। অভিভাবকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ফের পরীক্ষা নেওয়া হয়। এর পরও ১০১ জন নির্বাচনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
টিসি পাওয়া শিক্ষার্থীদের ফলেও প্রশ্ন
নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল থেকে টিসি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ফলও আলোচনায় এসেছে। নরসিংদী সানবীন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মেদ জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে নাছিমা কাদির মোল্লা স্কুল থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে ২৫ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে।
তদন্তের আওতায় আরও প্রতিষ্ঠান
শুধু নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস নয়, শতভাগ জিপিএ ৫ পাওয়া আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। একইভাবে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেছে– এমন প্রতিষ্ঠানকেও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক ড. মাসুদ রানা খান জানান, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করা কোনো শিক্ষার্থীকে শুধু এ প্লাস না পাওয়ার কারণে পরীক্ষার ফরম পূরণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ বোর্ডের নজরে এসেছে। সত্যতা যাচাইয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে।
মাসুদ রানা খান বলেন, নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফল ও ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আক্তারুজ্জামানও জানান, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন, টেস্ট পরীক্ষার ফল ও ফরম পূরণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এসব তথ্য পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, অনিয়ম প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
- বিষয় :
- এসএসসি