সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির শপথ
প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ফাইল ফটো)
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৯ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০০
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের (এমপি) প্রত্যক্ষ ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আয়োজিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ৩৪৯ ভোটের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের উত্তরসূরি হিসেবে বঙ্গভবনের বাসিন্দা হচ্ছেন বিএনপির দুর্দিনের কান্ডারি মির্জা ফখরুল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল। সংসদের অধিবেশন কক্ষে দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ছয়জন ভোটার অনুপস্থিত ছিলেন। বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন বিজয়ী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলামের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি দলের এমপিরা মুহুর্মুহু করতালি ও টেবিল চাপড়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
ফল ঘোষণার পর মির্জা ফখরুল ইসলামকে একটি গোলাপ ফুল উপহার দিয়ে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সিনিয়র নেতারা এগিয়ে এলে মির্জা ফখরুল ইসলাম নিজের আসন ছেড়ে সামনে এগিয়ে যান। প্রথমে তিনি বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। পরে বিরোধী দলের উপনেতাসহ অন্যান্য সিনিয়র নেতারাও নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোলাকুলি করে শুভেচ্ছা জানান।
দুপুর ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ভোটের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটের নির্দেশিকা তুলে ধরেন। এর পরপরই ভোট শুরু হয়। প্রথমে ২টা ৮ মিনিটে ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভোট দেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল। পরে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে ভোট দেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। এরপরে ভোট দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ভোট দেন ২টা ১৯ মিনিটে। সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে তাদের নির্ধারিত আসনে বসে ছিলেন এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ২০ জন কর্মকর্তা তাদের সহায়তা করেছেন এবং ব্যালট পেপার সরবরাহ করেন।
সরকারি দলের এমপিরা লাইন দিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। বাক্সে ব্যালট রাখার সময় অনেকে হাসিমুখে ছবি তোলেন। প্রথম দেড় ঘণ্টায় উপস্থিত সবাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নিয়ম রক্ষার জন্য বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট শুরু থেকে সোয়া ঘণ্টার বেশি সময় অধিবেশন কক্ষে নিজের আসনে অবস্থান করেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। পাশের আসনে ছিলেন দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম। এরপর ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও প্রবীণ এমপি খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
প্রধানমন্ত্রী যখন নিজের আসনে বসেছিলেন তখন এমপিরা সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সংসদ নেতা এমপিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের খোঁজখবর নেন। প্রধানমন্ত্রী বিকেল ৩টা ১৩ মিনিটে সংসদ কক্ষ ছেড়ে সংসদ ভবনের নিজ কার্যালয়ে যান। সঙ্গে নেন দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলামকে।
বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করে গণনা শুরু হয়। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন সিইসি। রাতেই গেজেট প্রকাশ করে ইসি।
সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকায় কেবল সেবারই ভোটাভুটি হয়। এরপর গত সাতটি নির্বাচনে একজন করে প্রার্থী থাকায় তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি যারা
অসুস্থতার কারণে ভোট দিতে না আসার কথা জানিয়ে ইতোমধ্যে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের এমপি মির্জা আব্বাস ও চট্টগ্রাম-৩ আসনের মোস্তফা কামাল পাশা। অনুপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের এমপি ওসমান ফারুক। এ ছাড়া সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি (জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত) গাজী নজরুল ইসলাম, দেশের বাইরে থাকায় খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান ভোট দিতে পারেননি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের এমপি রুমিন ফারহানা ভোট দিতে আসেননি। তবে তিনি কেন ভোট দেননি তা জানা যায়নি।
কর্নেল অলির অভিনন্দন
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ১১ দলীয় ঐক্যের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ও এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম। গতকাল এক অভিনন্দন বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি রাষ্ট্র ও সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং ইনসাফের সুরক্ষায় দৃঢ়তা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন। আমি তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করি।’
নতুন রাষ্ট্রপতিকে শুভেচ্ছা
মির্জা ফখরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাবে— এই প্রত্যাশা রাখি। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও দায়িত্ব পালনে আমি সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করছি।’
গণমাধ্যমে পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আশা করি, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখা, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।’
নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
১২ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে নতুন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, জোট মুখপাত্র ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব ড. মাওলানা মুফতি গোলাম মহিউদ্দিন ইকরামসহ অন্যান্য নেতা। এর বাইরে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপির) চেয়ারম্যান ও সমমনা জোটের প্রধান সমন্বয়ক ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, জাসদ (শাজাহান সিরাজ) সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন খান, মজলিস ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল প্রমুখ নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে মানুষের উচ্ছ্বাস
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, মির্জা ফখরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার খবরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠে তাঁর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও। জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীরা মিষ্টি বিতরণ করেন। পরে নেতাকর্মীরা একটি আনন্দ র্যালি বের করেন। শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা কার্যালয়ে গিয়ে এটি শেষ হয়।
ঠাকুরগাঁও শহরের হলপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, ‘মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নিবার্চিত হওয়ায় ঈদের চেয়েও আনন্দ লাগছে। কারণ ঈদ বছরে দুইবার এলেও তাঁর মতো মানুষ শত বছরেও আসে কিনা সন্দেহ আছে।’
ঠাকুরগাঁও রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মুবীন রতন বলেন, ‘শিক্ষকতা করার কারণে ছোট-বড় সবার স্যার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম। তিনি কেমন মানুষ বলে বোঝাবার ভাষা নেই। তবে এতটুকু বলতে পারি স্যারের ছাত্র হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।’
জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, ‘আমরা সবাই খুবই আনন্দিত। আনন্দিত হওয়ার কারণ ঠাকুরগাঁও থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিএনপির রাজনীতি শুরু। জেলা বিএনপির সভাপতি থেকে তাঁর উত্থান। তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ত্যাগ এবং তিতিক্ষার পরে তিনি তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু অর্জন করেছেন।’
- বিষয় :
- ভোট
- রাষ্ট্রপতি
- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
- শপথ