দেশে ‘কুশ’ আনছে ত্রিদেশীয় চক্র
এক মাসে তিনটি চালান জব্দ, গ্রেপ্তার ২
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৫০ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৩৫
দেশে এক সময়ের অপ্রচলিত মাদক ‘কুশ’ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। তীব্র আসক্তির এই নেশাদ্রব্য মূলত অভিজাত শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে জনপ্রিয়। আশঙ্কার বিষয় হলো, স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এর আসক্তি লক্ষ্য করা গেছে। আকাশপথে ও স্থলসীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে কুশের চালান। এর মধ্যে থাইল্যান্ড থেকে নিয়মিত কুশ আনছে ত্রিদেশীয় একটি চক্র। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে গত এক মাসে তাদের তিনটি চালান জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এ পর্যন্ত চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার এবং আরও তিনজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
ডিএনসি ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী পরিচালক ড. আবু সাঈদ মিয়া সমকালকে বলেন, বিশেষ জাতের গাঁজার ফুল প্রক্রিয়াজাত করে ‘কুশ’ হিসেবে বিক্রি হয়। সাধারণ গাঁজার থেকে এর নেশার তীব্রতা অনেক বেশি। দামী এই মাদক সাধারণ তামাকের মতো সেবন করা হয়। পাশাপাশি কেক, চকলেট, চুইংগাম এবং ভেপ (ই-সিগারেট) হিসেবেও পাওয়া যায়।
ডিএনসির এই কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি দেশে কুশ নিয়ে আসছে থাইল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি চক্র। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক কেন্দ্রিক কিছু মাদক কারবারি এগুলো সরবরাহ করছেন। তাদের কাছ থেকে কুশ ঢাকায় নিয়ে আসছেন কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক। তাদের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন এদেশীয় চার-পাঁচজন। তাদের অনেককে এরইমধ্যে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনার আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সর্বশেষ শনিবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে হোসেন আবদুল কাদের শেখ নামে এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছে পাওয়া যায় ৩ কেজি কুশের একটি চালান। তিনি কলকাতা থেকে ব্যাংকক যান। সেখান থেকে কুশ নিয়ে ঢাকায় আসেন। ভারতের মুম্বাইয়ে তার ‘সোহেল ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস’ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। পাশাপাশি পোশাক ব্যবসাও করেন। তিনি প্রায়ই থাইল্যান্ড ও চীনে যাতায়াত করেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি কেজি কুশের দাম প্রায় ২০ লাখ টাকা। এর আগে ১৮ আগস্ট বিমানবন্দরে ৪ কেজি ১০০ গ্রাম কুশ জব্দ করা হয়। ওই চালানটি আনেন ভারতীয় নাগরিক আকাশ দুবে ও আকাশ পান্ডে। তবে চালান জব্দের প্রক্রিয়া বুঝতে পেরে তারা বিমানবন্দর থেকে পালিয়ে যান। এখনও তারা বাংলাদেশে আছেন বলে জানা গেছে। এই চক্রের আরেক সদস্য জুলফিকার মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয় গত ২৪ জুলাই। তার কাছে পাওয়া যায় ১১ কেজি ৮০০ গ্রাম কুশ।

ডিএনসির এক কর্মকর্তা জানান, জুলফিকার মোল্লা কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু বিমানবন্দরে একটি বিমান প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর তিনি ব্যাংক ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনে ভাড়ায় চালান। পরে তিনি মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। শ্বশুরবাড়ি থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ রুপি ও ঋণ নেওয়া দুই লাখ রুপি নিয়ে তিনি ব্যাংকক যান। সেখান থেকে ৭ লাখ রুপির সমপরিমাণ মুদ্রা দিয়ে কুশের চালান নিয়ে ঢাকায় আসেন। এটি এদেশীয় সহযোগীদের হাতে পৌঁছে দিতে পারলে তিনি দুই লাখ টাকা লাভ পেতেন। এর আগে জুন মাসেও তিনি ঢাকায় একটি চালান এনেছিলেন বলে নিশ্চিত হয়েছেন ডিএনসি কর্মকর্তারা। তবে সেই চালানটি জব্দ করা যায়নি। জুলফিকারের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন তার চাচাতো ভাই আকরাম মোল্লা। তিনি কলকাতায় ডেকোরেটর ব্যবসা করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, তিনটি চালানের সঙ্গে পাঁচ ভারতীয় নাগরিকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের সহযোগী হিসেবে এদেশের চার–পাঁচজন আছেন, এমন আভাসও পাওয়া গেছে। কারণ ভারতীয় নাগরিকরা ঢাকায় চালান হস্তান্তর করেই ফিরে যান। এরপর দেশের ভেতরে কুশ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করেন চক্রের এদেশীয় সদস্যরা।
এমনকি ভারতীয়দের এখানে থাকার ব্যবস্থা, ধরা পড়লে আইনি সহায়তার ব্যবস্থাও তারা করেন। জুলফিকারের জামিনের জন্য চার-পাঁচজন আইনজীবী তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। কারাগারে যাওয়ার পরদিনই একজন গিয়ে জামা-কাপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে এসেছেন। তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ৬ আগস্ট বিজিবি সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে ১২ কেজি কুশসহ মো. তারিকুজ্জামান নাম একজনকে গ্রেপ্তার করে। চালানটি ভারতে যাচ্ছিল বলে ওই সময় জানান বিজিবি কর্মকর্তারা।
স্কুলছাত্র কুশে আসক্ত, কিনে দেন চিকিৎসক মা
ডিএনসি কর্মকর্তারা বলছেন, স্কুলপড়ুয়াদের কেউ কেউ কুশে আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী প্রচারণা চালাতে গিয়ে এমন তথ্য তারা পেয়েছেন। এ ছাড়া গত ২৬ মে শাহজালাল বিমানবন্দরে এক নারী চিকিৎসক ও তার ইংরেজ মাধ্যম স্কুলপড়ুয়া ছেলেকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। তাদের কাছে পাওয়া যায় ৫৯টি ইলেকট্রিক ভেপ। সেগুলোর মধ্যে ছিল কুশের মূল উপাদান টেট্রাহাইড্রো ক্যানাবিনল বা টিএইচসি। জিজ্ঞাসাবাদে ওই চিকিৎসক জানান, ছেলে ভেপের আবদার করেছিল, তাই তাকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে এগুলো কিনে দিয়েছেন। ছেলের বাবাও একজন চিকিৎসক বলে জানা গেছে।
দেশেই উৎপাদনের চেষ্টা
অনেক দেশেই কুশের (গাঁজা) চাষ নিষিদ্ধ হওয়ায় এখন ঘরের ভেতর কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। দেশেও এমন উদ্যোগ ধরা পড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার ওয়ারীতে কুশ উৎপাদন ও সংরক্ষণের পূর্ণাঙ্গ ল্যাবরেটরি পাওয়া যায়। জানা যায়, প্রবাসী তৌসিফ হাসান বিদেশে থেকে প্রযুক্তির সহায়তা ও সহযোগীদের মাধ্যমে দেশে নিজের বাসায় কুশ উৎপাদনের ল্যাব তৈরি করেন।
এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে দেশ প্রথমবার কুশ জব্দের কথা জানায় র্যাতব। তখন বলা হয়, ওনাইসী সাঈদ ওরফে রেয়ার সাঈদ নামে একজন বিদেশ থেকে ফিরে মাদক নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি কুশ, হেম্প, মলি, ফেন্টানলের মতো মাদকের চাষ ও বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাতকরণের উদ্দেশ্যে ল্যাবরেটরি তৈরি করেন।