ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নবায়নযোগ্য জ্বালানি

ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা দাম নির্ধারণের সুপারিশ, বিনিয়োগে প্রণোদনা চান উদ্যোক্তারা

ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা দাম নির্ধারণের সুপারিশ, বিনিয়োগে প্রণোদনা চান উদ্যোক্তারা
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৪৮

নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা দাম নির্ধারণের সুপারিশ করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, এই দামে নতুন বিনিয়োগ কতটা আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রথম পাঁচ বছর মাশুল কমিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন সুবিধা চেয়েছে সৌরবিদ্যুৎ খাতের সংগঠন বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।

রোববার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়ামে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের গাইডলাইন ও ট্যারিফ নিয়ে বিইআরসির গণশুনানিতে এসব প্রস্তাব ও মতামত উঠে আসে। শুনানিতে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ ও কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানি, সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোক্তা ও তাদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম, বিজিএমইএ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিদ্যা অমৃত খান, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান, বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী, বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মো. সুলাইমান এবং বিএসআরইএ-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ।

মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের ধারণাটি দেশে নতুন। এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তারা নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সরকারি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ব্যবহার করা যাবে নির্ধারিত মাশুলের বিনিময়ে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আর বিদ্যুৎ পৌঁছানোর জন্য ব্যবহার হবে সরকারি অবকাঠামো।

কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, সৌরভিত্তিক মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ সরকারি বিতরণ কোম্পানিগুলো কিনতে পারবে। কোনো সময়ে নির্ধারিত গ্রাহক বিদ্যুৎ না নিলেও ওই বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

কমিটির হিসাব অনুযায়ী, একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিট স্থায়ী সম্পদের মূল্য ৩২৬ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে নিয়ন্ত্রক কার্যকরী মূলধন ৪৪ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা যোগ করে মোট মূল্যভিত্তি ধরা হয়েছে ৩৭০ কোটি ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এর ওপর ৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ মুনাফা, জনবল, মেরামত ও প্রশাসনিক ব্যয় এবং অবচয় হিসাব করে মোট রাজস্ব চাহিদা ধরা হয়েছে ৫৯ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার টাকা। অন্যান্য আয় বাদ দিয়ে নিট রাজস্ব চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। বছরে নিট উৎপাদন ৯ কোটি ১৮ লাখ ৪০ হাজার ইউনিট ধরে ইউনিটপ্রতি ৬ টাকা ৪৮ পয়সা ট্যারিফ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

শুধু দিনের বেলায় নয়, রাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরির জন্য কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতার ১০ থেকে ২০ শতাংশ ক্ষমতার ব্যাটারি দিয়ে সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করেছে কারিগরি কমিটি। এতে দিনের বেলায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করে রাতে গ্রাহকের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

এই ট্যারিফ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি বলেন, বিদ্যমান সঞ্চালন ও বিতরণ মাশুলের চেয়ে বেশি নেওয়ার যৌক্তিকতা সংশ্লিষ্টরা তুলে ধরতে পারেননি। বিইআরসির কারিগরি কমিটিও বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। তার মতে, ভারত ও পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের দাম যথাক্রমে ৩ টাকা ৮০ পয়সা ও ৩ টাকা ৯০ পয়সা। বাংলাদেশে এর চেয়ে বেশি দাম নির্ধারণ করতে হলে তার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে।

অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, অতীতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটিকে বর্তমানের বেঞ্চমার্ক বা তুলনার ভিত্তি হিসেবে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ অতীতের অনেক ব্যয়ই ছিল অযৌক্তিক। বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত বাড়তি ব্যয় বা ভর্তুকির দায় নতুন বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপানো উচিত নয়।

তবে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে পিডিবি ও বিতরণ কোম্পানিগুলোও। তাদের আশঙ্কা, বড় শিল্পগ্রাহকরা দিনের বেলায় সরাসরি মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নিলে বিতরণ কোম্পানির আয় কমে যাবে। কারণ শিল্পগ্রাহকদের কাছে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয়। সেই আয় কমে গেলে আবাসিক গ্রাহকের কাছ থেকে তা পূরণ করা সম্ভব হবে না।

তবে এ ধরনের আশঙ্কার সমালোচনা করে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিতরণ কোম্পানিগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ফলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করলে বিতরণ কোম্পানিগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে— এমন ধারণা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়।

উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএসআরইএ-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, দেশে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে প্রথম পাঁচ বছর মাশুল কম হওয়া প্রয়োজন। এতে নতুন বিনিয়োগ আসার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, বিতরণ কোম্পানির ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রস্তুত থাকার পরও গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে না পারলে উদ্যোক্তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কোনো মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ বা চুক্তি বাতিলের আগে অন্তত ২০ বছরের মেয়াদ নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে তারা। একই সঙ্গে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া মার্চেন্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত অব্যবহৃত বিদ্যুৎ সরকারি ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহারের সুযোগ, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে কর ও শুল্ক সুবিধা এবং বিনিয়োগের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে বিএসআরইএ।

বিজিএমইএ-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিদ্যা অমৃত খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ধরে রাখতে শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ২০৩০ সালের পর কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রমাণ দেখাতে হবে। এ জন্য অন্তত ১০ বছরের জন্য সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন ব্যবহারের মাশুলে ছাড় দেওয়া দরকার।

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, জ্বালানি খাতের অতীতের অনিয়ম ও অদক্ষতার দায় নতুন বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপানো উচিত নয়। কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়ার জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বুয়েটের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী বলেন, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহারের মাশুল নির্ধারণে যথাযথ ও যাচাইযোগ্য বেঞ্চমার্ক দরকার। অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে ক্রস-সাবসিডিকে এক করে দেখা উচিত নয়। অতীতের ক্যাপাসিটি চার্জের দায়ও নতুন মার্চেন্ট পাওয়ারের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।

বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মো. সুলাইমান বলেন, বেসরকারি খাতকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা তৈরি করা যাবে না। সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জামের দাম কমলে মার্চেন্ট পাওয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ আরও বাড়বে।

শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা সবার মতামত শুনেছি। এরপরও কেউ মতামত দিতে চাইলে লিখিতভাবে দিতে পারেন। আমরা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেব।’     

আরও পড়ুন

×