তীব্র গরমে দেশের সোয়া দুই কোটি শিশু ঝুঁকিতে
জলবায়ুবিষয়ক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৬ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ শিশু প্রতিবছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত বিপজ্জনক তাপজনিত চাপের মুখে পড়ছে। এ সংখ্যা দেশের এই বয়সী মোট শিশুর প্রায় ৭৯ শতাংশ।
ব্রাসেলসের ভ্রিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে বছরে অন্তত পাঁচ মাস বা ১৫০ দিন মোট বিপজ্জনক তাপজনিত চাপের মুখে পড়া শিশুর সংখ্যাও প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন না থাকলে এ সংখ্যা প্রায় ৯০ লাখ হওয়ার কথা ছিল। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই কোটি ৬০ লাখে, যা এই বয়সী মোট শিশুর ৯১ শতাংশ।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত বড় সংকটের অংশ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী প্রায় ১৬ কোটি ৭৪ লাখ শিশু, অর্থাৎ এই বয়সী মোট শিশুর প্রায় ৬২ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের মুখে রয়েছে। এ অঞ্চলে বছরে অন্তত পাঁচ মাস বিপজ্জনক তাপজনিত চাপের মুখে থাকা শিশুর সংখ্যাও দ্বিগুণ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন না থাকলে এ সংখ্যা প্রায় আট কোটি হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১৫ কোটি ৬৬ লাখ।
বিশ্বজুড়ে গবেষণায় দেখা গেছে, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী সর্বোচ্চ ৫৬ কোটি শিশু, অর্থাৎ এই বয়সী মোট শিশুর ৪৩ শতাংশ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে প্রতিবছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের মুখে পড়ছে। অন্যান্য বয়সী মানুষের চেয়ে শিশুদের এ ঝুঁকি বেশি।
অতিরিক্ত গরমে শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে তাদের শরীর দ্রুত উত্তপ্ত হয়। ঘামের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে কম। এ ছাড়া অতিরিক্ত গরম থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে তারা প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর বেশি নির্ভরশীল। তীব্র গরমের কারণে শিশুদের পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোক হতে পারে। বিদ্যমান স্বাস্থ্য সমস্যাও আরও গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তাপ শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও মস্তিষ্কের বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণায় আর্দ্রতাজনিত তাপের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ছায়ায় ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাবকে তাপজনিত চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘামের মাধ্যমে শরীর কার্যকরভাবে তাপ ছেড়ে দিতে পারে না। ফলে এ ধরনের গরম শরীরের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
গবেষণার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা গেলেও বাংলাদেশে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ শিশু, অর্থাৎ ৮৭ শতাংশ প্রতিবছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের মুখে পড়তে পারে। একই সময়ে প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ শিশু, অর্থাৎ ৯৩ শতাংশ বছরে অন্তত পাঁচ মাস তাপজনিত চাপের মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে এই বয়সী প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ শিশু, অর্থাৎ ৯৮ শতাংশ প্রতিবছর অন্তত এক মাস অতিরিক্ত তাপজনিত চাপের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ শিশু, অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ বছরে অন্তত পাঁচ মাস তাপজনিত চাপের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ব্রাসেলসের ভ্রিজে বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক রোসা পিয়েত্রোইউস্তি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যেই কোটি কোটি শিশু বিপজ্জনক তাপের মুখে পড়ছে, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। উন্নয়নশীল দেশের শিশুরা এখন এবং ভবিষ্যতে জলবায়ুজনিত চরম পরিস্থিতির তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফন নেছা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র গরমের প্রভাব শিশুদের মধ্যেও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে রোদে খেলাধুলার পর হঠাৎ বমি, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অস্থিরতা ও ক্ষুধামন্দার মতো সমস্যা এখন আগের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, শিশুদের বসার ও খেলার জন্য ঠান্ডা জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। দুপুর ও বিকেলের কয়েক ঘণ্টা তাদের বাড়ির বাইরে যাওয়া থেকে বিরত রাখা দরকার। শিশুদের হালকা ও বাতাস চলাচলের উপযোগী পোশাক পরাতে হবে। শিশুদের প্রচুর পানি পান করানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণার ফল বলছে, চরম তাপমাত্রা এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামগ্রিক বিকাশের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। শিশুদের সুরক্ষায় শিশুকেন্দ্রিক তাপ মোকাবিলা পরিকল্পনা, শক্তিশালী তাপজনিত স্বাস্থ্য প্রস্তুতি, জলবায়ু সহনশীল জনসেবা এবং তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তাপ ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত কমানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দারিদ্র্য, অপর্যাপ্ত আবাসন, শীতল পরিবেশে থাকার সীমিত সুযোগ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ শিশুদের তীব্র গরমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আরও কমিয়ে দিতে পারে।
- বিষয় :
- গরম