ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের কফিনে ফেরা, স্বজনের কান্নায় বিদায়

রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের কফিনে ফেরা, স্বজনের কান্নায় বিদায়
×

সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত মো. ফরিদের মরদেহ ফিরেছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাড়িতে। গতকাল শুক্রবার সকালে উপজেলার উদনপৈ গ্রামে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর দুই বোন সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংসারের অভাব ও ঋণের বোঝা হালকা করতে আর স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাতে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সেই স্বপ্ন আজ পুড়ে ছাই; নিজ মাতৃভূমিতে কফিনে বন্দি হয়ে ফিরেছেন তারা। নওগাঁর আত্রাই, রাজশাহীর বাগমারা এবং নাটোরের নলডাঙ্গার স্বজনহারাদের হৃদয়বিদারক সেই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর

সেই টিকিটেই কফিনবন্দি হয়ে ফেরা শ্যামলের
বাগমারা উপজেলার মরুগ্রাম ডাঙ্গাপাড়ার বাসিন্দা শ্যামল উদ্দিন মাঝি (৪৬)। তিন কন্যার সুখের ভবিষ্যতের আশায় আট বছর আগে সৌদি পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু দালালের প্রতারণায় বৈধ কাগজপত্র পাননি। 

অবশেষে পরিবারের ইচ্ছায় একেবারে দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিট কিনেছিলেন। কিন্তু তাঁর লাশ হয়ে কফিনে ফেরা ভেঙে দিয়েছে পুরো পরিবারকে। ১৯ দিন আগে রিয়াদের আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া শ্যামলের ঘরে আজ শুধুই হাহাকার। 
বাগমারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ মৃতের জানাজায় অংশ নিয়ে পরিবারটির পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।

এত লাশ আগে কখনও দেখেনি আত্রাইবাসী
নওগাঁর আত্রাই উপজেলা সদরের মোল্লা আজাদ মেমোরিয়াল সরকারি কলেজ মাঠ। সেখানে শায়িত সাতটি কাঠের কফিন। রিয়াদের অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের মধ্যে আত্রাইয়ের সাতজনের লাশ প্রথম দফায় দেশে এসে পৌঁছায়। এক সঙ্গে এতগুলো লাশের সারি আগে কখনও দেখেনি আত্রাইবাসী।
জানাজা শুরুর আগে স্বজনদের কফিন খোলার অনুমতি দেওয়া হলে কান্না আর বিলাপের আওয়াজে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয় গণ্ডগোহালী গ্রামের প্রবীণ বাবা গুফফার প্রামাণিকের কান্নায়। অগ্নিকাণ্ডে তিনি তাঁর দুই সন্তান– মোহন আলী ও সুমন আলীকে এক সঙ্গে হারিয়েছেন। অশ্রুসজল চোখে উপস্থিত মুসল্লির উদ্দেশে বলেন, ‘আমার দুই ছেলে এক সঙ্গে চলে গেছে। আপনারা আমার ছেলেদের মাফ করে দিয়ে দোয়া কইরেন।’
পরে স্থানীয় গণ্ডগোহালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা করা হয় আরও চার প্রবাসীর। তারা হলেন, উপজেলার উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে ফরিদ, গণ্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল প্রামানিক, বজলুর রহমানের ছেলে কলিমউদ্দিন।

সন্তানের সঙ্গে ভিডিও কলেই শেষ দেখা সোহেলের
আত্রাইয়ের ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা সুমনের (৩০) করুণ উপাখ্যান যেন পাথরকেও গলিয়ে দেয়। ঘটনার দিন সকালেও রিয়াদ থেকে ভিডিও কল দিয়ে আট মাসের অবুঝ ছেলে তাসরিফকে দেখে হেসেছিলেন সোহেল। কিন্তু কে জানত, ওই হাসি হবে বাবা-ছেলের শেষ দেখা!
কয়েক ঘণ্টা পরেই কারখানার আগুনে ছাই হয়ে যায় সোহেলের সব স্বপ্ন। নিঃস্ব পরিবারটিকে টেনে তুলতে নিজের দেড় বিঘা জমি ও মায়ের গয়না বেচে সৌদি গিয়েছিলেন। আজ নিথর কফিনের পাশে আট মাসের অবুঝ শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নিস্তব্ধ হয়ে বসে আছেন সোহেলের স্ত্রী আমেনা। বৃদ্ধা মা স্বপ্না বেগম কেঁদে বলছিলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেই ছিল শেষ বয়সের লাঠি। পরিবারের হাল ধরতে বিদেশে গেল, আর ফিরল লাশ হয়ে!’

ঋণ পরিশোধ করা হলো না রবিউলের
নলডাঙ্গা উপজেলার মহিষডাঙ্গা গ্রামের মো. আশরাফুল ইসলামের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫)। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে পাঁচ বছর আগে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে দেশ ছেড়েছিলেন। সাড়ে তিন বছর বেকারত্বের যন্ত্রণা কাটিয়ে যখন উপার্জনের মুখ দেখতে শুরু করেছিলেন, তখন রিয়াদের কারখানার আগুন কেড়ে নিল তাঁর জীবন।
মৃত্যুর আগের রাতে মায়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল রবিউলের। মাকে বলেছিলেন, ‘মা, এখন ঘুমাব, পরে কথা বলব।’ সেই ঘুম রবিউলের চিরদিনের ঘুম হয়ে রইল। জরাজীর্ণ বাড়িটা পাকা করবেন এবং ছোট ভাইকে নিয়ে ভাগ্যোন্নয়ন করবেন– এই ছিল রবিউলের স্বপ্ন। কিন্তু কফিনবন্দি দেহ ফিরে আসায় এখন সে স্বপ্ন ধূলিসাৎ। রবিউলের পুরো পরিবার এখন দিশেহারা। নলডাঙ্গা উপজেলা প্রশাসন ও সরকারি অনুদান হিসেবে তাঁর পরিবারকে তিন লাখ ৩৫ হাজার টাকার চেক হস্তান্তর করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×