ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কামরুল-মেননের পরামর্শে শত শত ছেলে-মেয়েদের হত্যা করা হয়েছে: ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শী

কামরুল-মেননের পরামর্শে শত শত ছেলে-মেয়েদের হত্যা করা হয়েছে: ট্রাইব্যুনালে প্রত্যক্ষদর্শী
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:৩৭

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ১৪ দলীয় জোট নেতা সাবেকমন্ত্রী কামরুল ইসলাম ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এক প্রত্যক্ষদর্শী জাকির হোসেন।

বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্রুনাল-১-এ আজ রোববার তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এ মামলার দুই নম্বর সাক্ষীর বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায়। বর্তমানে ঢাকার লালবাগে থাকেন। তার দুই ছেলে জুলাই-আগস্ট জুলাই আন্দোলনে অংশ নেন।

জবানবন্দিতে ৫৫ বছর বয়সী জাকির হোসেন বলেন, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর আজিমপুরের মেয়র হানিফ জামে মসজিদে মাগরিবের নামাজরত অবস্থায় পেছন থেকে যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সদস্যরা মুসল্লিদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে পেছনের দুই কাতারে থাকা অনেকে গুলিবিদ্ধ হন।

সাক্ষী জাকির বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আন্দোলনকারী ছাত্রদের রাজাকার আখ্যা দেন শেখ হাসিনা। প্রতিবাদে পরদিন আন্দোলনে নামেন ছাত্র-জনতা। আমার দুই ছেলেও অংশ নেন। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে আমাদের ছেলেদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ, চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ সারাদেশে ছয়জন আন্দোলনকারী শহীদ হন। এরপর ১৭, ১৮ ও ১৯ জুলাইয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা আন্দোলন ও হতাহতের বর্ণনা দেন তিনি। 

সাক্ষী আরও বলেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলন বলপ্রয়োগ করে দমনের জন্য প্রয়োজনে গুলি করতে ওবায়দুল কাদেরকে পরামর্শ দেন এই মামলার দুই আসামি কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেনন। তাদের কুপরামর্শ অনুযায়ী আমাদের শত শত ছেলে-মেয়েদের গুলি চালিয়ে হত্যা ও আহত করেছে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও পুলিশ।’ 

আনিসুল-সালমানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন ‘ক’গেজেটভুক্ত আহত জুলাইযোদ্ধা মো. শাকিল আহম্মেদ। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দি দেন তিনি।

তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে-কারফিউ জারির মাধ্যমে মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি, প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্র। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের ধারাবাহিক নির্দেশনা ও কর্মকাণ্ডের ফলে মিরপুর-১, ২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র হামলায় বহু ছাত্র-জনতা নিহত হন। এসব নির্যাতন বন্ধে তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়।

জবানবন্দিতে শাকিল জানান, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বিকেলে মিরপুর-১০ নম্বরে আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। পরদিন স্টেডিয়ামের সামনে এসে দেখতে পান, পুলিশ ও সিভিল পোশাকে থাকা কিছু লোক রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ সময় পুলিশের কাছে মিরপুর-১০ নম্বরে যাওয়ার অনুমতি চাইলে অকথ্য ভাষায় আমাদের গালিগালাজ করে। একজন পুলিশ তার কোমরে থাকা পিস্তল আমার সামনে থাকা একজন এলাকার বড় ভাইয়ের পেটে ঠেকিয়ে গালি দিয়ে বলে, ‘পিছনে চলে যা, নয়তো গুলি করে দিবো’। এরপর ৪ আগস্ট বিকেলে মিরপুর-১০ নম্বর ফলপট্টির গলিতে যাওয়ার পর দেখতে পান, পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লোকেরা আন্দোলনকারীদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করছে। তিনি বলেন, একটি গুলি এসে বাম নিতম্বের ভেতর দিয়ে ঢুকে পেটের ভেতর দিয়ে ডান রানের গোড়া দিয়ে বের হয়ে যায়।’ এ পর্যায়ে সাক্ষী তার গুলির ক্ষতস্থানগুলো ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী শাকিল আরও বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে আনুমানিক এক হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং আনুমানিক ২৫ হাজার আন্দোলনকারীকে গুলিবিদ্ধ করে পঙ্গু ও আহত করা হয়েছে। এ ঘটনার মূলে ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত।’ এরপর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মিডিয়ার মাধ্যমে, বিশেষ করে বিবিসি থেকে জানতে পারি, এই কারফিউয়ের পেছনে মূল হোতা ছিলেন সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হক। আমি আরও জানতে পারি, সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হকের একটি অডিও ভাইরাল হয়। যাতে আমি শুনতে পাই, একজন আরেকজনকে বলছেন, কারফিউ জারি করে আন্দোলনকারীদেরকে শেষ করে দিতে হবে।’

শাকিল আরও বলেন, ‘এই দুইজন ছিলেন শেখ হাসিনার কু-পরামর্শদাতা। এদের কু-পরামর্শের কারণে শেখ হাসিনা কারফিউ দিতে রাজি হন। এই কারফিউয়ের কারণে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালাতে সাহস পায়।’

আহত শাকিল বলেন, আমার এই অবস্থার জন্য এবং আন্দোলনে যেসব ব্যক্তিকে নিহত ও আহত করা হয়, তার জন্য সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক দায়ী, তাদের বিচার চাই। আমার যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাই।

আরও পড়ুন

×