ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইন: সংশোধনের পরও অস্পষ্টতা কাটেনি

মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইন: সংশোধনের পরও অস্পষ্টতা কাটেনি
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের বিলে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। এতে শৃঙ্খলা বাহিনী ও বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাহিনীকে প্রতিবেদন দিতে হবে। তবে বাহিনী তা না দিলে কী হবে– তা নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।

স্থায়ী কমিটির সুপারিশ করা সংজ্ঞা সংশোধন করে গুম প্রতিরোধ আইনের বিল পাস হয়েছে। এতে বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা বাহিনীকেই দেওয়া হয়েছে। তবে যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নয়; অন্য বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত করবে। মানবাধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন, কোন বাহিনী গুম করেছে, তা তদন্তের আগে কীভাবে জানা যাবে?
গত রোববার সংসদে পাস হওয়া বিল দুটি রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর আইনে পরিণত হবে। বিল দুটি পাসের সময় প্রতিবাদে ওয়াকআউট করেছিল বিরোধী দল। তাদের অভিযোগ, বিল দুটির মাধ্যমে সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গুম করার ক্ষমতা থাকছে। 

সরকার এই বিল দুটির প্রথম যে খসড়া করেছিল, মন্ত্রিসভায় যেসব খসড়া অনুমোদন হয়েছিল– এর সঙ্গে সংসদে পাস হওয়া বিলের কিছু পার্থক্য রয়েছে। বিরোধী দল, ভুক্তভোগী ও অংশীজনের দাবির মুখে মানবাধিকার কমিশন আইনে কমিশনকে গোপন বন্দিশালা, কারাগার, হাজতসহ যে কোনো জায়গায় পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই ক্ষমতা যথেষ্ট নয়; কারণ আলামত জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য জানতে পারেনি সমকাল।

অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এতে কমিশনকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। গুমের তদন্তের ক্ষমতাও দেওয়া হয়। বিএনপি অধ্যাদেশ দুটি পাস না করায় একসময় বাতিল হয়ে যায়। গত রোববার নতুন বিল পাস করে।
বিলের খসড়ার সময়েই জানা গিয়েছিল, অধ্যাদেশের মতো কমিশনের কাছে গুমের তদন্ত করার ক্ষমতা থাকছে না। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, আনসারসহ শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে তা তদন্ত করবে না কমিশন।  

কমিশন সময় নির্ধারণ করতে পারবে, তবে প্রশ্ন
উত্থাপিত বিলের ১৯ ধারায় বলা হয়েছিল, আইনের অন্যান্য ধারায় যা কিছুই থাকুক, বাহিনী ও বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এলে কমিশন তা তদন্ত না করে যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। বাহিনী প্রতিবেদন দেওয়ার পর কমিশন তাতে সন্তুষ্ট না হলে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে পারবে। এই সুপারিশ ৪৫ দিনের মধ্যে কার্যকর না করলে কমিশন নিজে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। 

কমিশন প্রতিবেদন চাইলে বাহিনী তা কত দিনের মধ্যে দেবে– এই সময়সীমা নির্ধারিত না থাকায় বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকারকর্মীরা প্রশ্ন তোলেন– আইনের ফাঁক গলে বাহিনীগুলো দীর্ঘ সময় পার করে দিতে পারবে। এই সময়ের মধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আলামতের প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাবে। এমন সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বিলটি আইন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়। কমিটি সংশোধনের সুপারিশ করে। পাস হওয়া বিলের ১৯(২) ধারায় যুক্ত করা হয়েছে, প্রতিবেদন চাওয়া হলে কমিশনের নির্ধারিত সময়ে বাহিনী তা দাখিল করবে। 

সরকারের তরফে এ বিধানকে সমস্যার সমাধান হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, সংশোধনীটি চাতুরীপূর্ণ। কারণ, কমিশনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাহিনীগুলো প্রতিবেদন না দিলে কী হবে, তা বিলে বলা নেই। যেমন– কমিশন সাত দিন সময় দিয়ে প্রতিবেদন চাওয়ার পর বাহিনীগুলো যদি তা পালন না করে, তাহলে পরের ধাপ কী হবে, স্পষ্ট নয়। কারণ ১৯(৩) উপধারায় বলা হয়েছে, প্রতিবেদন সন্তোষজনক না হলে কমিশন ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে। প্রশ্ন উঠেছে, কমিশন ১৯(২) অনুযায়ী প্রতিবেদন না পেলে কীভাবে ১৯(৩) ধারা অনুযায়ী সুপারিশ করবে? 

বিলে বলা হয়েছে, কমিশন ব্যবস্থা গ্রহণের যে সুপারিশ করবে, তা ৪৫ দিনের মধ্যে কার্যকর করতে হবে। নইলে কমিশন নিজেই তদন্ত করতে পারবে।

জানতে চাইলে সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস সমকালকে বলেন, কমিশন নিজে তদন্ত না করে বাহিনীর প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করলে তো অসন্তুষ্ট হওয়ার কারণ থাকবে না। আর নিজে তদন্ত করা ছাড়া কীভাবে সুপারিশ করবে?

বাহিনীকে শাস্তি দেওয়া যাবে কিনা অস্পষ্টতা 
বাহিনী কমিশন নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন না দিলে কী হবে– এর জবাবে সরকারের তরফে বলা হয়েছে, বিলের ২৭ ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে যে আদেশ দেবে, তা পালনে বাধ্যবাধকতা থাকছে। নইলে শাস্তি হবে। মানবাধিকারকর্মীরা এ ক্ষেত্রে দুটি প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলেছেন, বিলের ২ ধারা অনুযায়ী, ব্যক্তি এবং শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা আলাদা। যদিও এই ধারায় প্রতিষ্ঠানকে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। ২৭ ধারায় বলা হয়নি, কমিশন আদেশ না মানলে শৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যের কী শাস্তি হবে। এই অস্পষ্টতা রয়েছে। 

মানবাধিকার কমিশনের এক সাবেক সদস্য সমকালকে বলেন, বিলের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অন্যান্য ধারায় যা কিছু থাকুক না কেন’। এর অর্থ হচ্ছে, এ ধারায় যেসব বিধান রয়েছে, তা আইনের অন্যান্য ধারার ঊর্ধ্বে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন না দিলে ২৭ ধারার বলে বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যদের সাজা দেওয়া যাবে না। এর মাধ্যমে আইনটির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। কারণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন বাহিনী এবং বাহিনীর সদস্যরা করেন। অন্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষমতা সীমিত। 

সাবেক গুম কমিশনের সদস্য এবং মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন সমকালকে বলেন, পাস হওয়া বিলটিতে প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। কমিশনকে যে কারও বিরুদ্ধে তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হবে, সেই প্রত্যাশা ছিল; কিন্তু তা হয়নি। কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিলে বাহিনীর ওপর যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাতেও ফাঁক রয়েছে। এখন দেখতে হবে, কীভাবে আইনটির প্রয়োগ হয়।

পাস হওয়া বিলে স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনায় অধ্যাদেশের মতো যোগ হয়েছে, চেয়ারপারসনসহ পাঁচ সদস্যের মানবাধিকার কমিশনে অন্তত একজন হবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জাতিগোষ্ঠীর। অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন এবং কমিশনার নিয়োগের বাছাইয়ে কমিটিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি বা তাঁর মনোনীত ব্যক্তিকে সদস্য করার বিধান রাখা হয়েছিল। আইনের খসড়ায় যা বাদ দেওয়া হয়েছিল। পাস বিলে তা আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এ বিধান যুক্ত হলেও স্পিকারের সভাপতিত্বে গঠিত ১০ সদস্যের বাছাই কমিটির পাঁচজন সরকার বা সরকারি দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

গুম আইনেও অস্পষ্ট
পাস হওয়া বিলে দাড়ি, কমার পরিবর্তন এনে গুমের সংজ্ঞায় কিছু শব্দগত সংশোধন আনা হয়েছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের মতো। যদিও অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে গুমের তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, যা বিলে নেই।

বিলের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, গুমের অভিযোগে ভুক্তভোগী বা তাঁর পক্ষে কেউ থানায় মামলা করতে পারবে। থানা মামলা না নিলে আদালতে নালিশি মামলা করা যাবে। অভিযোগের তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে। তবে যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা বাদে অন্য কোনো বাহিনী তদন্ত করবে।

স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে থাকা নূরুল ইসলাম বুলবুল সমকালকে বলেন, অতীতে দেখা গেছে, সাদা পোশাকে বাহিনী তুলে নেয়। কোন বাহিনী তুলে নিয়েছে, তা জানা যায় না। ফলে কার বিরুদ্ধে মামলা করবে ভুক্তভোগী? আর তদন্ত ছাড়া কীভাবে জানা যাবে যে কোন বাহিনী গুম করেছে? সরকারের সুবিধার জন্য এসব অস্পষ্টতা রাখা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

 

আরও পড়ুন

×