ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অব্যবস্থাপনায় বাড়ছে মৃত্যু

১০ জেলায় উচ্চ সংক্রমণ, টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন

৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরাও ঝুঁকিতে

১০ জেলায় উচ্চ সংক্রমণ, টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন
×

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার প্রায় ছয় মাস হলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। প্রতিদিনই বাড়ছে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। বর্তমানে মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছুঁইছুঁই। দেশের ৬৪ জেলাতেই হাম ছড়িয়েছে। তবে ১০ জেলায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক অনেক বেশি। সন্দেহভাজন ও হাম রোগীর সংখ্যা ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। এর পরই আছে চট্টগ্রাম, বরিশাল, কক্সবাজার ও সিলেট।

এদিকে গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি শুরুর সময় সরকার জানিয়েছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই দেশে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবে এবং হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে পাঁচ মাস ২৩ দিন পার হলেও সংক্রমণ কমার লক্ষণ নেই। এ নিয়ে টিকা কর্মসূচির কার্যকারিতা ও কাভারেজ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৯৭। একই সময়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক লাখ ৮৫ হাজার ৬০ জন।

জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৮ হাজার ৬৬৬। এর মধ্যে সন্দেহভাজন রোগী ৪৭ হাজার ৮৬১ এবং নিশ্চিত রোগী ১০ হাজার ৮০৫ জন। এ জেলায় মৃত্যু হয়েছে ৪১৪ জনের। আক্রান্তের সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম। সেখানে সন্দেহভাজন সাত হাজার ২৮৩ এবং নিশ্চিত ৭৪৪ জনসহ মোট আক্রান্ত আট হাজার ২৭ জন। মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের।
বরিশালে মোট আক্রান্ত সাত হাজার ২০৮ জন। এর মধ্যে সন্দেহভাজন সাত হাজার ৬৪ এবং নিশ্চিত রোগী ১৪৪ জন। এ জেলায় মৃত্যু হয়েছে 

৫৫ জনের। কক্সবাজারে আক্রান্ত ছয় হাজার ৪২০ জন। এর মধ্যে সন্দেহভাজন ছয় হাজার ১৮৯ এবং নিশ্চিত ২৩১ জন। সেখানে মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের। সিলেটে আক্রান্ত ছয় হাজার ৬৯ জন। এর মধ্যে সন্দেহভাজন পাঁচ হাজার ৭১০ এবং নিশ্চিত রোগী ৩৫৯ জন। এ জেলায় মৃত্যু হয়েছে ৬৪ জনের। আক্রান্তে শীর্ষ ১০ জেলার মধ্যে অন্যগুলো হলো নোয়াখালী, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা। নোয়াখালীতে মোট আক্রান্ত পাঁচ হাজার ৮১৯, ফরিদপুরে পাঁচ হাজার, কুমিল্লায় চার হাজার ৫০৩ জন। 

লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকায়ও নিয়ন্ত্রণে নেই হাম
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার প্রায় তিন সপ্তাহ পর জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। এরপর ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের গণহারে টিকা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি চলে ২০ মে পর্যন্ত। কর্মসূচি শুরুর সময় সরকার সারাদেশে অন্তত এক কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এপ্রিল ও মে মাসের ক্যাম্পেইনে প্রায় এক কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি হিসাবে টিকার কাভারেজ হয়েছে শতভাগেরও বেশি। তবে শুরু থেকেই এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এর একটি বড় কারণ, একই বয়সী শিশুদের নিয়ে জুনে হওয়া ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণ কর্মসূচির তথ্য। সেখানে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হয়। ফলে হামের টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ব্যবহৃত জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে টিকাদান শুরু করা ঠিক ছিল। কিন্তু এরপর তৃণমূলের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের প্রকৃত সংখ্যা ও টিকার অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া এবং পরিস্থিতি শুরুতেই যথাযথভাবে স্বীকার না করা। হাম নিয়ন্ত্রণে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। এই মাত্রায় টিকাদান না হলে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো কঠিন।

চিকিৎসা দেরিতে শুরু হলে বাড়ছে মৃত্যু

হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যাদের চিকিৎসা সময়মতো শুরু করা যাচ্ছে না, তাদের মধ্যেই মৃত্যুর হার বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ঢাকার বাইরে থেকে আসা রোগীদের মধ্যে অনেক সময় জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, বাইরে থেকে আসা কিছু রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের কেউ কেউ মারা যাচ্ছে। আজিমপুরের বাসিন্দা আক্তার হোসেনের তিন মাস বয়সী মেয়ে ফাতিমা জান্নাত কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিল। পরে সারা শরীরে র‍্যাশ দেখা দিলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গু নয়, শিশুটির হাম হয়েছে। 

সরকারের অগ্রাধিকার হারাচ্ছে হাম
রোগতত্ত্ববিদ ও জাতীয় হাম-রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে হাম সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রায় সব বয়সী শিশুর মধ্যে সংক্রমণ রয়েছে। ছয় থেকে ৯ মাস, ৯ মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর– সব বয়সী শিশুর মধ্যে হাম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি। কোথাও কোথাও সংক্রমণ কিছুটা কমলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ঘোষিত টিকাদান কাভারেজ বাস্তবে কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সরকারের ১০৩ শতাংশ কাভারেজের দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। তাঁর মতে, লক্ষ্য নির্ধারণেই অসংগতি থাকলে কাভারেজের হিসাবও বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এখন প্রয়োজন তথ্য-প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ। কোন এলাকায় এবং কোন বয়সী শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করে সেই এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। 

মাহমুদুর রহমানের অভিযোগ, হাম এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, অতীতে কোনো ক্যাম্পেইনের পর সংক্রমণ দ্রুত কমে যেত। এবার তা হচ্ছে না। আলোচনা নেই, বিশেষ ব্যবস্থা নেই, শুধু সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। শুরু থেকেই তারা হামকে মহামারি ঘোষণা বা স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারির কথা বলে আসছিলেন। এমন ঘোষণা দেওয়া হলে সব দিক থেকে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো। একসঙ্গে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে হাম এত দীর্ঘায়িত হতো না।

টিকা সরবরাহে ছিল জটিলতা
গতকাল সংসদে বিরোধীদলীয় এক সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন এবং এর পরবর্তী জটিলতার কথা তুলে ধরেন। দেশ দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফ ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন–গ্যাভির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হামের টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি পরিবর্তন করে মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর তৎকালীন প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, জরুরি জীবন রক্ষাকারী টিকার ক্ষেত্রে মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি উপযুক্ত নয়। এতে টিকার সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এ বিষয়ে ইউনিসেফ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয় এবং প্রায় ১০টি বৈঠকে সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে। তবে সেই সতর্কবার্তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে সংসদে তুলে ধরা হয়েছে।

নতুন দরপত্র পদ্ধতি চালুর পর ফাইল ও কাগজপত্রের প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। আন্তর্জাতিক গুদামে টিকা মজুত থাকা সত্ত্বেও ঢাকা থেকে সময়মতো চূড়ান্ত অনুমোদন ও অর্থ ছাড় না হওয়ায় টিকার চালান দেশে পৌঁছাতে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ছয় মাসে গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। ফলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির জরুরি প্রয়োজনের দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া যায়নি বলে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকাদান কার্যক্রম পিছিয়ে যায়। পরে ২০২৫ সালে সরকারের পক্ষ থেকে একটি পরিপূরক হাম-রুবেলা বিশেষ ক্যাম্পেইন বাতিল করা হয়। এর ফলে নিয়মিত টিকাদানের আওতা কমে যায়। পরে দেশের শিশু এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করে।

 

আরও পড়ুন

×