বিশ্লেষণ
হাম পরিস্থিতি শুরুতে স্বীকার না করাই বড় দুর্বলতা
ডা. মুশতাক হোসেন
ডা. মুশতাক হোসেন
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শুধু টিকাদান বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ে পরিকল্পিত টিকাদান, ঝুঁকিপূর্ণ রোগী শনাক্তকরণ ও সেকেন্ডারি পর্যায়ের হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কারণ, টিকা ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ চিকিৎসার ঘাটতিতে হাম নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।
এ জন্য টিকা না পাওয়া শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অপুষ্ট শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জ্বর ও হামের উপসর্গ দেখা দিলে হাসপাতালে রেখে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া এবং পরিস্থিতির শুরুতেই এটি যথাযথভাবে স্বীকার না করা। হাম নিয়ন্ত্রণে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। এই মাত্রায় টিকাদান না হলে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানো কঠিন।
ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯৫ শতাংশকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য পূরণ হয়নি। জনস্বাস্থ্যকর্মীরা বিষয়টি আগে বললেও তা যথাযথভাবে স্বীকার করা হয়নি। ফলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও কমেছে। সংক্রমণ কিছুটা কমে আসার পর আবার হাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে টিকাদানের ঘাটতি বড় কারণ। শুধু যারা টিকা নিতে আসবে, তাদের টিকা দিলেই হবে না; যেসব শিশু টিকা পায়নি, তাদের খুঁজে বের করে টিকার আওতায় আনতে হবে। হামের মতো জরুরি টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রেও মাঠ পর্যায়ের পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিটি টিকাদান ক্যাম্পেইনের আগে ইপিআইয়ের নিয়মিত কার্যক্রমে যে ধরনের ‘মাইক্রো-প্ল্যানিং’ করা হয়, এবার সেটি পুরোপুরি করা সম্ভব হয়নি। মাইক্রো-প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে প্রথমে টিকার উপযোগী শিশুদের তালিকা করা হয়। এরপর তাদের অভিভাবক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়– কেন টিকা দেওয়া হচ্ছে, কোথায় দেওয়া হবে এবং কখন দেওয়া হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্থান, যেমন– বাড়ির উঠান, স্কুল বা স্থানীয় কোনো কেন্দ্রে টিকাদানের ব্যবস্থা করা হয়।
এই তিনটি কাজের সমন্বয়েই নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি সফল হয়। কিন্তু জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত টিকাদান শুরু করতে গিয়ে সেই প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে দ্রুত মাইক্রো-প্ল্যানিংয়ের কাজও করা হয়নি। শুরুর দিকে টিকার স্বল্পতা ছিল। এ কারণে অনেক জায়গায় মানুষকে উপজেলা হাসপাতাল পর্যন্ত এসে টিকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এলাকায় এলাকায় মাইকিং করে বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা না দেওয়ায় অনেক শিশু কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে। এখন পর্যাপ্ত টিকা থাকলে আর অপেক্ষা না করে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী যেসব শিশু টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে। শুধু স্থায়ী কেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে ভাসমান ও ঠিকানাবিহীন শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। ফুটপাত বা অন্যান্য স্থানে থাকা পথশিশুদের খুঁজে বের করে ভ্রাম্যমাণ ব্যবস্থায় টিকা দিতে হবে।
হামের বিস্তার বাড়ায় শুধু পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু নয়, ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুরাও ঝুঁকিতে পড়েছে। এই বয়সী শিশুদের মধ্যেও টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশে নেওয়া প্রয়োজন। একটি জনগোষ্ঠীর বড় অংশ টিকা না পেলে ভাইরাসের বিস্তার থামানো যায় না। ফলে হামের নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের উচ্চ কাভারেজ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
হামের বিস্তার বেড়ে যাওয়ায় ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। সাধারণত এই বয়সে টিকা দেওয়ার নিয়ম নেই। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির কারণে শিশুর কিছুটা সুরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু ব্যাপক সংক্রমণের পরিস্থিতিতে এই সুরক্ষা যথেষ্ট নাও হতে পারে। বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হলে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে ছোট শিশুরাও সংক্রমিত হতে পারে। হামে মৃত্যুহার কমাতে হলে টিকাদানের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করার ওপর জোর দিতে হবে।
গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর রোগীকে রাজধানীতে পাঠানোর পরিবর্তে উপজেলা ও সেকেন্ডারি পর্যায়ের হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে, বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র ও ভাসমান পরিবারের শিশুরাই অপুষ্টির কারণে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এসব শিশুর জ্বর হলে শুরুতেই পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বরের কারণ নির্ণয়ে হাম ও ডেঙ্গু দুই রোগকেই বিবেচনায় রাখতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কোনো শিশু জ্বর নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী ডেঙ্গুর পরীক্ষা করতে হবে। হাম সন্দেহ হলে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। হামের লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুকে পর্যবেক্ষণে রেখে পরে লক্ষণ চিকিৎসার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- হামের উপসর্গ
- হাম
- স্বাস্থ্য