জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেবেন তারেক রহমান, তুলে ধরবেন পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে যাচ্ছেন কাল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (ফাইল ফটো)
কামরুল হাসান, নিউইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:০৫ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:০৬
নতুন এক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবছরের মতো এবারও জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন শুরু হয়েছে। গত শুক্রবার স্থানীয় সময় সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধিবেশনের উদ্বোধন হয়। এতে যোগ দিতে আগামীকাল সোমবার নিউইয়র্কে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। এর মধ্য দিয়ে মা-বাবার পারিবারিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আসছেন তারেক রহমান।
এদিকে দীর্ঘদিন পর তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর স্মরণীয় করে রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। দফায় দফায় বৈঠক করছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের স্বাগত জানাতে নিউইয়র্কের জনএফ কেনেডি বিমানবন্দরে যাবেন হাজারো নেতাকর্মী। গতকালও কয়েকটি প্রস্তুতি সভা করেছেন তারা।
কর্মব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রধানমন্ত্রী
স্থানীয় সময় সোমবার নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর কর্মব্যস্ত সময় কাটাবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে অবস্থান করবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফরের শুরুতে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। বৈঠকে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদান, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্যকর অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা প্রাধান্য পাবে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন মিত্র দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাইডলাইন বৈঠকের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এসব আলোচনায় দেশের জাতীয় স্বার্থ, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। এসডিজি অগ্রগতি পর্যালোচনা, ডিজিটাল উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক একাধিক উচ্চপর্যায়ের সাইড-ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখবেন।
তুলে ধরবেন নতুন বাংলাদেশের পরিকল্পনা
জাতিসংঘ অধিবেশনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ভাষণে বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকার, সংস্কার কার্যক্রম এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নিয়ে সরকারের লক্ষ্য ও পরিকল্পনার কথা জানাবেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ ২০০০ সালে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
পারিবারিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতায় এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দিতে আসছেন তারেক রহমান। একই পরিবারের তিন বিশিষ্ট রাজনীতিকের বিশ্বমঞ্চে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখার এই ঘটনা দেশের রাজনীতিতে এক বিরল ও ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে।
আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘের ১১তম সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এরপর ২০০৫ সালে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন।
নতুন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর, অর্থনৈতিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অগ্রাধিকারগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে জাতিসংঘে বাংলায় বক্তব্য রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভূ-রাজনীতি ও অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরেছিলেন। প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একাধিকবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও সর্বজনীন অধিকার নিয়ে বিশ্বের দরবারে বক্তব্য উপস্থাপন করেন।’
৮১তম অধিবেশন শুরু
স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশন শুরু হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এ বছরের প্রতিপাদ্য–‘একসঙ্গে, আমরা পারব’। এই প্রতিপাদ্য বর্তমান পরিস্থিতির তাগিদ এবং আশাবাদ উভয়কেই তুলে ধরে।
সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, যেসব ১৩৯টি লক্ষ্যমাত্রার তথ্য পাওয়া গেছে, তার মধ্যে ৩৬ শতাংশ সঠিক পথে রয়েছে অথবা মধ্যম অগ্রগতি অর্জন করেছে– যা আগের বছরের তুলনায় ইতিবাচক। তবে এই অগ্রগতি এখনও অত্যন্ত ধীর এবং অসম। অর্থায়নের ঘাটতি, জলবায়ুর আঘাত, ঋণের বোঝা, সংঘাত ও বৈষম্য অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে। তা সত্ত্বেও রূপান্তর এখনও সম্ভব; কিন্তু লক্ষ্যগুলোর অগ্রগতি বাড়াতে প্রয়োজন বড় পরিসরে সমন্বিত উদ্যোগ, ধারাবাহিক বিনিয়োগ, মজবুত অংশীদারিত্ব এবং নতুন করে আন্তর্জাতিক সংহতি।
উদ্বোধনী অধিবেশনে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বক্তব্য রাখেন। এতে চারটি সেশন ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি নেতাদের ব্যাপক প্রস্তুতি
এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর স্মরণীয় করে রাখতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য গিয়াস আহমেদ বলেন, আমরা সব নেতাকর্মী প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। জনএফ কেনেডি বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে নেতাকর্মীর ঢল নামবে।
বোস্টন বিএনপির সভাপতি বদরা সাইদ বলেন, দীর্ঘদিন পর প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফর ঘিরে প্রবাসীদের মাঝে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।
যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আবু সাঈদ আহমেদ বলেন, দলীয় প্রধানের সফর ঘিরে নিউইয়র্কে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয়েছে।
নিউইয়র্ক দক্ষিণ মহানগর বিএনপির সভাপতি সেলিম রেজা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে জাতিসংঘের অধিবেশনে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্র আসছেন, এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।