ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

চীনের গুয়াংজুতে বাংলাদেশিদের ব্যবসার ঠিকানা সানইউয়ানলি

চীনের গুয়াংজুতে বাংলাদেশিদের ব্যবসার ঠিকানা সানইউয়ানলি
×
×

সানইউয়ানলি এলাকার একটি মার্কেট। ছবি: সংগৃহীত

 জাহিদুর রহমান, গুয়াংজু (চীন) থেকে

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১৯

চীনের গুয়াংজু শহরের সানইউয়ানলি এলাকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ব্যস্ততা। দোকানে দোকানে কেউ দেখছেন পণ্য, কেউ করছেন দরদাম, আবার কেউ সরবরাহকারীর সঙ্গে কথা বলে নিজ দেশে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা করছেন। ব্যাগ, জুতা, পোশাক, প্রসাধনীসহ নানা পণ্যের বাজার ঘিরে এখানে আসেন বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশিও। এই ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশিদের পরিচিত ব্যবসায়িক পরিসর। রয়েছে বাংলাদেশি খাবারের হোটেল, সুপারশপ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান। এসব প্রতিষ্ঠানে কেনাকাটার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেখা-সাক্ষাৎ, নতুন পরিচিতি তৈরি এবং ব্যবসায়িক তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগও হয়।

কেউ দীর্ঘদিন ধরে চীনে ব্যবসা করছেন, কেউ বাংলাদেশ থেকে পণ্য কিনতে এসে এখানে পরিচিতি গড়েছেন। আবার কেউ নতুন করে ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজছেন। তাদের অভিজ্ঞতায় চীনের বিশাল বাজারে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি আছে প্রতিযোগিতা, ভাষাগত বাধা, বিনিয়োগের ঝুঁকি ও আইনি প্রক্রিয়া সামলানোর চ্যালেঞ্জ।

সানইউয়ানলির বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের একজন আব্দুল্লাহ আল মামুন। তাঁর বাড়ি বাংলাদেশের গাইবান্ধায়। দীর্ঘদিন দুবাইয়ে প্রবাসজীবন কাটানোর পর পাঁচ বছর ধরে চীনের গুয়াংজুতে ‘স্বপ্ন সুপারশপ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত দুজন কর্মচারীই বাংলাদেশি।

দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে মামুন বলেন, প্রবাসে ব্যবসা করতে হলে শুধু পুঁজি থাকলেই হয় না; জানতে হয় বাজারের চাহিদা, ক্রেতার পছন্দ এবং স্থানীয় নিয়মকানুনও। চীনে ব্যবসা করতে আসার আগে ঠিক করতে হবে কী ধরনের ব্যবসা করা হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিয়ম ও প্রস্তুতি আলাদা।

সরবরাহকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন মামুন। প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত উৎপাদক, নাকি মধ্যস্বত্বভোগী, তা যাচাই করতে হবে। পণ্যের নমুনা, মান, সরবরাহের সময় এবং অর্থ পরিশোধের শর্ত লিখিতভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও ব্যাংক হিসাব যাচাই করা উচিত। চীনে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিসা, কোম্পানি নিবন্ধন, কর ও অন্যান্য আইনি অনুমতির বিষয়গুলোও বুঝে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। দোকান বা রেস্তোরাঁর ভাড়া, কর্মীদের বেতন, পণ্য পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের হিসাব শুরু থেকেই সংরক্ষণ করা উচিত বলে মনে করেন এ ব্যবসায়ী।

সানইউয়ানলিতে বাংলাদেশি অনেক খাবার হোটেল আছে। এর মধ্যে হোটেল আল নূরের মালিক আব্দুল আজিজের বাড়ি বাংলাদেশে। তিনি বলেন, বিদেশে দীর্ঘদিন থাকলে নিজের দেশের খাবারের চাহিদা তৈরি হয়। একই সঙ্গে ব্যবসায়িক কাজে চীনে আসা বাংলাদেশিদের জন্য বাংলায় কথা বলা, পরিচিত পরিবেশে কিছু সময় কাটানো এবং প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময়ের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, বিদেশে বাংলাদেশি খাবারের চাহিদা থাকলেও ব্যবসা চালাতে অনেক হিসাব মেলাতে হয়। দোকান ভাড়া, কর্মীর বেতন ও অন্যান্য খরচ নিয়মিত দিতে হয়। নতুন কেউ এ ব্যবসায় আসতে চাইলে আগে বাজার বুঝতে হবে, তারপর বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

চীনের বাজারে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের উপস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পণ্য সংগ্রহ ও আমদানি-রপ্তানি। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল পান্না এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। তিনি গুয়াংজুর বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিদেশি ব্যবসায়ীরা পণ্য সংগ্রহের সুযোগ পান। মোস্তফা কামাল পান্না বলেন, চীন থেকে পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক সরবরাহকারী নির্বাচন এবং পণ্যের মান নিশ্চিত করা। শুধু কম দাম দেখে অর্ডার দিলে পরে সমস্যায় পড়তে পারেন। 

দীর্ঘদিন ধরে চীনে ব্যবসা করা বাংলাদেশিদের পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তারাও এখানে সম্ভাবনা খুঁজছেন। তাদের একজন চট্টগ্রাম থেকে আসা জোবায়ের রায়হান। তিনি বলেন, চীনে ব্যবসার সুযোগ রয়েছে, তবে নতুনদের আগে বাজার বুঝতে হবে। কোন পণ্যের চাহিদা আছে, কোথা থেকে কিনলে ভালো হবে এবং দেশে আনতে কত খরচ পড়বে, তা না জেনে বিনিয়োগ করা ঠিক হবে না। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসায়ী রেজওয়ান কবির বাংলাদেশ থেকে এসেছেন চীনের ক্যান্টন ফেয়ারে। তিনি বাংলাদেশে ইন্টারনেট সরঞ্জামের ব্যবসা করেন। রেজওয়ান বলেন, সানইউয়ানলিতে বাংলাদেশিদের ব্যবসায়িক পরিসরের সুবিধা হলো, এখানে নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বাজার, পণ্য সংগ্রহ ও দৈনন্দিন সমস্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। তবে পরিচিত মানুষের উপস্থিতি মানেই ব্যবসা সফল হবে, এমন নয়। চীনে ব্যবসা করতে হলে স্থানীয় আইন, ভাষা, করব্যবস্থা এবং বাজারের প্রতিযোগিতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। 

আরও পড়ুন

×