ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

হাতটা বাঁধবেন না, আমাদের কাছে আবার আসতে হবে

রাজধানীতে ১৯টি সংগঠনের গোলটেবিল বৈঠক

হাতটা বাঁধবেন না, আমাদের কাছে আবার আসতে হবে
×
×

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। গতকাল রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১২:১১

 সাইবার অপরাধ দমনের নামে সরকারের সমালোচনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রাখা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। কোনো ব্যক্তির অপরাধে সংবাদমাধ্যম বন্ধ, সন্দেহের ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম জব্দ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা দেওয়ার মতো বিধান অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করবে। এ ছাড়া অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে সামাজিক মাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন করেও সুফল পাওয়া যাবে না।

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসব উদ্বেগ জানিয়ে আইনটির নিবর্তনমূলক ধারা বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। গতকাল রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। টিআইবি, ব্র্যাক, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ ১৯টি সংগঠন এ আয়োজন করে।

সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োজন, তবে সরকারের সমালোচনা ও অপরাধকে এক করে দেখা যাবে না। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবেই। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, এ কথা বিবেচনায় রেখেই আইন প্রণয়ন করা উচিত। ক্ষমতা হারানোর পর ক্ষমতাসীনরাও অন্যায়ের শিকার হতে পারেন বলে সতর্ক করেন তিনি।

সরকারের উদ্দেশে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’ 

প্রস্তাবিত আইনে কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে পুরো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা দেওয়ার বিরোধিতা করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ থাকলে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাসীন নেতার ফোনেও কাউকে গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কোনো সংবাদ কারও অপছন্দ হলেই সেটিকে ভুল তথ্য বা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত বলে দাবি করার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। প্রস্তাবিত আইন নিয়ে জেলায় জেলায় আলোচনা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার আহ্বানও জানান নোয়াব সভাপতি।

সামাজিক মাধ্যমের জবাবদিহি জরুরি

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সামাজিক মাধ্যমের মুনাফাকেন্দ্রিক অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন করে অপতথ্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, ব্যবসায়িক স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্য বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ও যৌক্তিক আলোচনাকে সেন্সর করে। সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া খবর ছড়ানোর পেছনে প্ল্যাটফর্মগুলোর আর্থিক মুনাফার স্বার্থও ভূমিকা রাখে। তাঁর মতে, অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে সফল হতে হলে অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর আইন চাপিয়ে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়। অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে বর্তমান কাঠামোয় আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সরকারের জন্যও বুমেরাং ও আত্মঘাতী হতে পারে। অপতথ্য ঠেকানোর নামে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে আইন সংশোধনের আহ্বান জানান তিনি।

ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, রামুতে বৌদ্ধপল্লিতে হামলা ও ২৫টি প্যাগোডা ভাঙচুর, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যায় উস্কানি এবং সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সংঘবদ্ধ হামলা ও পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনায় ফেসবুকের অপব্যবহার হয়েছে। তাঁর মতে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ কঠিন হচ্ছে।

প্রস্তাবিত আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বাতিলের দাবি জানান শফিকুল আলম। মানহানির ক্ষেত্রে ফৌজদারি ব্যবস্থার পরিবর্তে দেওয়ানি আইনে ক্ষতিপূরণ ও বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখার পরামর্শ দেন তিনি। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে বড় পত্রিকাগুলো সম্ভাব্য মানহানি মামলার জরিমানা পরিশোধের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখে। বাংলাদেশেও এমন ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে কারও সম্মানহানি করলে তাঁকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। সামাজিক মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং লাগামহীন অপপ্রচার থেকে সুরক্ষার উপায় বের করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

তদন্ত কর্মকর্তার ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত আইনে তদন্ত কর্মকর্তাদের শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে একটি পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। একজন ব্যক্তির অপরাধ বা ভুলের কারণে পুরো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার বিধানও উদ্বেগজনক। এ ছাড়া আইনে মানহানির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় অপপ্রয়োগের আশঙ্কা রয়েছে। গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নে তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সাইবার কাউন্সিলে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্বের দাবি

রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু প্রস্তাবিত আইনের দায়মুক্তির বিধান, অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লকের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান। সাংবাদিকতা ও মূলধারার গণমাধ্যম যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দাবি করেন তিনি।

জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের গঠনকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শরীফুজ্জামান পিন্টু। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান করে পাঁচজন মন্ত্রী, নয়জন সচিব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের নিয়ে কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত হয়নি। নির্বাহী বিভাগের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে কাউন্সিলের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্য হিসেবে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

আরও পড়ুন

×