ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

এলডিসি উত্তরণে বাড়তি তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ

এলডিসি উত্তরণে বাড়তি তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ
×
×

 মেসবাহুল হক 

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৭ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হতে আরও তিন বছর সময় পেল বাংলাদেশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ বিষয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের একই তারিখে এলডিসি থেকে বের হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপালও উত্তরণের জন্য তিন বছর সময় পেয়েছে। 

বৈশ্বিক সংকট, দেশে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, অর্থনীতির ধীরগতিসহ নানা কারণে এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দিতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘে অনুরোধ করেছিল। কেননা, এলডিসি থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্ন দেশে পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশসহ অগ্রাধিকার বাজার সুবিধা হারানো, ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্বের নিয়মকানুন পালন, নমনীয় ঋণ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতো। সরকার ও বেসরকারি খাত মনে করছে, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মতো সক্ষমতা এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। ব্যবসায়ীরা এ কারণে বারবার সরকারকে উত্তরণ পেছানোর উদ্যোগের তাগিদ দিয়ে আসছিলেন। 
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বৃহস্পতিবার রাত ১টায় শুরু হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের প্লেনারি মিটিংয়ে বাংলাদেশ ও নেপালের উত্তরণ পেছানোর প্রস্তাব  অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান। বৈঠকের শুরুতে জি-৭৭ গ্রুপের পক্ষে উরুগুয়ের প্রতিনিধি এ বিষয়ে খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কোনো দেশের প্রতিনিধি এর বিরোধিতা করেননি। ফ্রান্স, কানাডা ও আয়ারল্যান্ডের (ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে) প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর বিষয়ে সমর্থন দিয়ে বক্তব্য দেন। তবে সবাই তাদের বক্তব্যে বাংলাদেশে সংস্কারের তাগিদ দেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমান সামাজিক মাধ্যম এক্সে  লিখেছেন, সাধারণ পরিষদ একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও নেপালকে স্বল্পোন্নত দেশের শ্রেণি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত তিন বছর সময় দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাহ্যিক অভিঘাত এবং অব্যাহত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিকে স্বীকৃতি দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সময় বাড়ানো মানে পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী অগ্রগতির জন্য একটি বিনিয়োগ। উত্তরণ এমনভাবে হওয়া উচিত, যাতে উন্নয়ন এগিয়ে যায়, ব্যাহত না হয়। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। 

জাতিসংঘ বলেছে, সাম্প্রতিক সংঘাত এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট বিঘ্নের কারণে অনিশ্চিত মাত্রার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
 বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা, বহির্বিশ্বের ধাক্কার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ও দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দেশটিকে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিন বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণত কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পালাবদলকে উত্তরণের সময় বাড়ানোর কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের জটিলতা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য দাবি বিবেচনায় নিয়েছে।

এলডিসি থেকে মসৃণ উত্তরণের জন্য জাতিসংঘ বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া ও বর্ধিত সময়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। জাতিসংঘের সহায়তায় এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে জাতীয় মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানিয়েছে। এ কৌশল বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে সিডিপির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদনে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সমকালকে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বাড়তি সময় পাওয়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এলডিসি থেকে বের হলে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে গড়ে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতো। এই মুহূর্তে এই অভিঘাত মোকাবিলা কঠিন ছিল। যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সময় প্রয়োজন, যাতে উত্তরণ মসৃণ ও টেকসই হয়। 

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্লক যেমন– ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ও জাপান, কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পণ্য পরিবহন বা লজিস্টিকস উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে। বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। 

রপ্তানিকারকরা খুশি, সংস্কারে জোর অর্থনীতিবিদদের  
এলডিসি থেকে উত্তরণে বাড়তি তিন বছর সময় পাওয়ার জন্য সুখবর মনে করছেন রপ্তানিকারকরা। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সমকালকে বলেন, ‘আমরা এই সিদ্ধান্তকে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবেই দেখছি। এটি আমাদের সবার সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। সরকারের পক্ষ থেকে বেশ জোরালো পদক্ষেপ ছিল। উত্তরণ পেছাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে জাতিসংঘের মহাসচিবের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি লিখেছেন।’ 

বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, তিন বছরের মধ্যে রূপান্তরের প্রক্রিয়া মসৃণ করা, সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারগুলো সুসংহত করা না গেলে সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। তবে তিনি মনে করেন, সে রকম কিছু হবে না। তিনি আশা করেন, তিন বছরের প্রস্তুতিকালে মসৃণ ও টেকসই উত্তরণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে বাংলাদেশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান সমকালকে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন বছর পেছানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ সৃষ্টি করলেও এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের অসম্পূর্ণ চিত্রও তুলে ধরেছে। কভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক অভিঘাত, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং দেশের রাজনৈতিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তা এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকে নিঃসন্দেহে কঠিন করে তুলেছে। 

মসৃণ উত্তরণের সুপারিশ প্রসঙ্গে সেলিম রায়হান বলেন, আগামী তিন বছরে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকাশের পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। 
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সতর্ক করেন, এসব সংস্কার যেন শুধু সরকারি পরিকল্পনা, নীতিগত ঘোষণা কিংবা কাগজে-কলমের প্রতিশ্রুতির মধ্যে আটকে না থাকে। বাস্তব অর্থনীতিতে সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ ও ইতিবাচক ফল দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে ২০২৯ সাল এলেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর স্বয়ংক্রিয় সমাধান হয়ে যাবে না। এখন থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন না করা হলে নতুন সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও দেশকে একই ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। 

সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে যেসব আন্তর্জাতিক প্রাক্কলন 
এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) ও জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) পৃথক সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাক্কলন প্রকাশ করে। ২০২০ সালের মে মাসে প্রকাশিত ডব্লিউটিওর এক গবেষণায় বলা হয়, এলডিসি সুবিধা হারালে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ বা প্রায় ৫৩৭ কোটি ডলার কমতে পারে। এ হিসাবের ভিত্তি ছিল ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের গড় রপ্তানি এবং ২০১৬ সালের শুল্কহার। গবেষণায় তৈরি পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবের আশঙ্কা করা হয়। 

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত আঙ্কটাডের ‘ট্রেড প্রেফারেন্সেস আউটলুক ২০২৫’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রপ্তানি ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারানোর কারণে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৩২ শতাংশ কমতে পারে। ২০২৩ সালের রপ্তানির ভিত্তিতে এর সম্ভাব্য আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১৭৫০ কোটি ডলার। আঙ্কটাডের বিশ্লেষণে তৈরি পোশাক ও জুতা খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট 
১৯৭৫ সালে এলডিসির তালিকাভুক্ত হয় বাংলাদেশ। এরপর থেকে পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ বিভিন্ন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছে। এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর অগ্রগতি প্রতি তিন বছর পরপর মূল্যায়ন করে জাতিসংঘের কমিট ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক– এই তিনটি মানদণ্ড বিবেচনা করা হয়।

২০১৮ এবং ২০২১ সালে জাতিসংঘের ওই কমিটির ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। এর ভিত্তিতে ২০২৪ সালে উত্তরণের সুপারিশ করা হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির অভিঘাত মোকাবিলা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির জন্য উত্তরণের সময় দুই বছর বাড়ানো হয়। সে অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তরণের সর্বশেষ নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। 

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে অনড় থাকার নীতি গ্রহণ করে। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে গত ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে। এদিকে সার্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও দীর্ঘদিন ধরে এলডিসি উত্তরণ তিন থেকে পাঁচ বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকদের আশঙ্কা, এলডিসি-সুবিধা হারালে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে রপ্তানি খাতে।

ব্যবসায়ীদের মতে, উত্তরণের পর বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার আওতায় পাওয়া শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরও কঠোরভাবে প্রযোজ্য হবে। উৎপাদিত পণ্য ও সেবায় নগদ সহায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি দেওয়ার সুযোগও সীমিত হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এতে দেশের রপ্তানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎসবিধি আরও কঠোর হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে তৈরি পোশাকশিল্পে।

কূটনৈতিক সাফল্য মনে করছে সরকার 
উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদনের সিদ্ধান্তকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখছে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন। শুক্রবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মিশন জানায়, এ সিদ্ধান্তের ফলে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং এলডিসি-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যসুবিধা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশ অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাবে। এটি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নতুন সরকার গঠনের পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন করে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে এ আবেদন করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে সরকার তিন বছরের একটি কর্মপরিকল্পনাও প্রণয়ন করে। এতে প্রতিবছরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। বর্ধিত সময়ে কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

বাড়তি সময়ে সরকারের পরিকল্পনা
অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়তি প্রস্তুতিকালে অন্তত ২৫টি সংস্কার ও প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সরকার। বাণিজ্য, আর্থিক খাত, রাজস্বব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ ও রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনার আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মুক্ত বাণিজ্য বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি হয়েছে। এ ছাড়া ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা বাড়ানো, সংকটাপন্ন সম্পদব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

 

আরও পড়ুন

×