ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

এলডিসি উত্তরণ নিয়ে বিশেষজ্ঞ মত

এই সুযোগ নষ্ট করা যাবে না

এই সুযোগ নষ্ট করা যাবে না
×
×

এম. মাসরুর রিয়াজ

এম. মাসরুর রিয়াজ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৩ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের আগে বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দেওয়ার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তটি স্বাগত জানানোর মতো এবং সময়োপযোগী। উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে পিছিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর নির্ধারণ করায় বাংলাদেশ কিছুটা স্বস্তির সময় পেয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, রপ্তানির ওপর চাপ, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে এই বাড়তি সময় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।  সময় বৃদ্ধি না হলে এসব দুর্বলতা মোকাবিলা করার আগেই বাংলাদেশকে এলডিসি-পরবর্তী বিভিন্ন সমন্বয় ও পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হতো। এর ফলে বাণিজ্য সুবিধা, ব্যবসায়িক ব্যয় এবং বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ওপর চাপ আরও আগেই চলে আসত। এই সিদ্ধান্ত অনিশ্চয়তা কমিয়েছে এবং উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশকে আরও সময় দিয়েছে। এর ফলে টেকসই উত্তরণের সম্ভাবনা জোরদার হয়েছে। 

তবে তিন বছর খুব বেশি সময় নয়। ২০২৯ সালে উত্তরণের পর ধীরে ধীরে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা এবং এলডিসিকেন্দ্রিক নীতিগত নমনীয়তার সুযোগ সংকুচিত হবে। যদিও বিভিন্ন বাণিজ্য অংশীদারের ক্ষেত্রে এর সময়সীমা ভিন্ন হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) কর্মসূচির আওতায় উত্তরণের পর আরও তিন বছর পর্যন্ত রূপান্তরকালীন সুবিধা পাওয়া যাবে। এর পর জিএসপি প্লাস বা অন্য কোনো অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে।  উৎসবিধি, পরিবেশগত শর্ত এবং পণ্যের মানদণ্ড আরও কঠোর হলে বাজারে প্রবেশের ব্যয়ও বাড়বে। 

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী, ওষুধের পেটেন্টসহ মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত এলডিসি-নির্দিষ্ট ট্রিপস (ট্রেড-রিলেটেড অ্যাসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস) রূপান্তরকালীন সুবিধাগুলো উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে। এর ফলে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্স গ্রহণ ও নীতিমালা পরিপালনের চাপ বাড়তে পারে। ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আরও বিস্তৃত মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে ডিজিটাল খাতের জন্য আলাদা কোনো ট্রিপস অব্যাহতি নেই। 

এই ঝুঁকিগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাই এই বাড়তি সময়কে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে একটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের সূচনা হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। সংস্কারের প্রয়োজন অনেক। তবে এসব সংস্কারকে একটি সমন্বিত, সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ছয়টি ক্ষেত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে আগেভাগেই আলোচনা শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়া এবং উৎসবিধি পরিপালনের সক্ষমতা জোরদার করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও পণ্যের মানোন্নয়ন। উচ্চমূল্যের পোশাক ও কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের পাশাপাশি চামড়াপণ্য ও জুতা, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং ডিজিটাল সেবা খাতকে সহায়তা দিতে হবে।

তৃতীয়ত, ব্যবসায়িক ব্যয় কমানো। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বন্দরের কার্যক্রম দ্রুততর করা, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা, দক্ষ লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, কঠোরতর মানদণ্ডের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত সক্ষমতা, মান সনদ, পরিবেশগত নীতিমালা পরিপালন এবং পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের প্রতিটি ধাপের অনুসরণযোগ্যতা জোরদার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র রপ্তানিকারকদের জন্য সাশ্রয়ী সহায়তার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
পঞ্চমত, উৎপাদনশীলতা ও অর্থায়ন বাড়ানো। স্থায়ী ভর্তুকির পরিবর্তে রপ্তানি কার্যক্রমের পরিমাপযোগ্য সাফল্য, শ্রমিকদের দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অর্থায়নের সুযোগের সঙ্গে প্রণোদনাকে যুক্ত করতে হবে।

ষষ্ঠত, সংস্কার বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এলডিসি উত্তরণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নয়নে তিন বছর মেয়াদি একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য নিয়মিত প্রকাশ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের মতামত ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সংলাপের একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা কার্যকর হবে।
শেষে বলতে চাই, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে কিছুটা স্বস্তির সময় দিয়েছে, সংস্কারের বিকল্প দেয়নি। সরকার ও ব্যবসায়ী খাত এখন একসঙ্গে কাজ করলে আগামী তিন বছর একটি সম্ভাব্য কঠিন উত্তরণকালকে আরও বহুমুখী, প্রতিযোগিতামূলক ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগে পরিণত করতে পারে।

ড. মাসরুর রিয়াজ, চেয়ারম্যান, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ 
 

আরও পড়ুন

×