ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার

একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছেন দীপ, মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা

ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়া চেষ্টা হচ্ছে: তাহসিফের বাবা

একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছেন দীপ, মৃত্যুর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা
×
×

টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার এই মাঠে তাহসিফ সাউরিসহ বসে কথা বলছিলেন বলে দাবি করেছেন তাঁর জুনিয়র বন্ধু দীপ। ধাওয়ার সময় এই স্তম্ভটির আড়ালে দাঁড়ান তিনি। গতকাল শুক্রবার তোলা -সমকাল

 সমকাল প্রতিবেদক 

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৫৫ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার তুরাগ নদের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকায় অন্তত ১৪ ঘণ্টা ধরে ভাসছিল বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ। তাহসিফের বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তুরাগের যে স্থানে ঘটনার সূত্রপাত, সেটি শনাক্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। 

তবে মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। ময়নাতদন্তসহ বেশ কিছু প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের হবে বলছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, কেন, কী কারণে এত রাতে তুরাগ নদের পারে একটি অপরাধপ্রবণ এলাকায় তাহসিফ ও দীপ গেলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। 

দীপের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার মধ্যরাতে তাহসিফসহ তিনি টঙ্গী পশ্চিম থানার তুরাগ নদ-সংলগ্ন হাজী মাজার বস্তি এলাকায় যান। এর অদূরে নদ শনাক্তকরণের ২৯ নম্বর পিলার। মধ্যরাতে দুজন ইউনিফর্মধারী লোক তাদের ধাওয়া করেন। তিনি বলেন, নিজেকে আড়াল করতে তিনি (দীপ) পিলারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। এক পর্যায়ে সেখান থেকে পালিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় আসেন তিনি (দীপ)। 

পুলিশ জানায়, দীপের তথ্য অনুযায়ী হাজী মাজার বস্তি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় সেখানে পড়ে ছিল। পুলিশ বলছে, যে মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফ বাসা থেকে বের হয়েছেন, সেটিই উদ্ধার করা হয়েছে। 
নম্বরহীন থাকায় মোটরসাইকেলটির মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে। 

তাহসিফের ঘটনার ছায়া তদন্ত করছে পিবিআই। মূল তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে নৌ পুলিশ। পিবিআই ছায়া তদন্তের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য নৌ পুলিশকে দিচ্ছে। 
নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিম সমকালকে বলেন, ‘মৃত্যুর কারণের বিষয়ে আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। অন্যান্য সংস্থাও তদন্তে আমাদের সহায়তা করছে। আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে।’ 

টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘হাজী মাজার বস্তি এলাকা ও বস্তি-সংলগ্ন ইজতেমার মাঠে মাদক বেচাকেনা চলে। তাই সেখানে পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে। মঙ্গলবার রাতেও টহল ছিল। তবে টহলে থাকা পুলিশ সদস্যরা কাউকে ধাওয়া দিয়েছে এ ধরনের কোনো তথ্য আমাকে জানানো হয়নি।’ 
নৌ পুলিশের এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গতকাল বিকেলে সমকালকে বলেন, তাহসিফের পরিবারকে মামলার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু থানায় এখনও মামলা করেনি তাঁর পরিবার। যদি তারা কোনো মামলা না করে, তবে পুলিশকেই হয়তো মামলা করতে হবে। 
 
ঘটনাস্থলে যা দেখা গেল
টঙ্গী আবদুল্লাহপুর ব্রিজ থেকে নামলেই টঙ্গী বাজার। বাজারের বিপরীত পাশে সেনাকল্যাণ কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স। কমপ্লেক্সটির পাশ দিয়ে গেছে হোন্ডা রোড। এই রোড ধরে একটু এগোলে বাঁ পাশে টঙ্গী হাজী মাজার বস্তি। হোন্ডা রোড থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল (তাহসিফের পানিতে পড়ে যাওয়া) থেকে মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থানের দূরত্ব আধা কিলোমিটারের মতো। হোন্ডা রোড থেকে হাজী মাজার বস্তির এক পাশে সম্রাট ইন্ডাট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটির পাশ ধরে কিছুটা সামনে গেলে ইজতেমার মাঠ। 

গতকাল দুপুর ১টার দিকে হোন্ডা রোডে দেখা যায়, পুলিশের হাতে জব্দ মোটরসাইকেলটি রাস্তায় রাখা। দুপুর দেড়টায় পুলিশের গাড়িতে এটি নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয়রা জানান, গত বুধবার থেকে মোটরসাইকেলটি রাস্তার এক পাশে রাখা ছিল। গতকাল সকালে পুলিশ এসে জব্দ করে।

ইজতেমার মাঠে ঢুকতেই ইজতেমার জন্য নির্মিত ২৬ ও ২৭ নম্বর টয়লেটের স্থাপনা। সেখানে ছোট ছোট দলে বিভিন্ন বয়সী মানুষ বসে আছে। কেউ গল্প করছেন, কেউ মোবাইলে গেমস খেলছেন। সেখান থেকে দুই-তিন মিনিট হাঁটার পরই তুরাগ নদের ২৯ নম্বর পিলার। সেখানে পরিবেশ নিরিবিলি। মাঠে মাদকের খালি বোতল চোখে পড়ে। এই পিলারটি থেকে ৪০ গজ দূরে তুরাগতীর। স্থানটির কাছে নদীর অপর তীরে কামারপাড়া মোড়। 

ইজতেমার মাঠে অবস্থান করা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাজী মাজার বস্তির একপাশে ও ইজতেমার মাঠের এই স্থানটিতে মাদক ব্যবসা চলে। গত দুই-আড়াই মাস আগে পুলিশ এখানে অভিযান চালালেও পরিস্থিতি বদলায়নি। আগের মতোই এখনও ব্যবসা রমরমা। টঙ্গীসহ আশপাশের এলাকার লোকজন এখানে মাদক সেবন করেন। 

গাজীপুর থেকে আসা এক গাড়িচালক বলেন, ‘এখানে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইনসহ বিভিন্ন মাদক বেচাকেনা হয়। মাঝে মাঝে এখানে আসি। মাদকাসক্ত হয়ে গেছি, তাই না এসে উপায় নেই।’
বৃহস্পতিবার রাতে তথ্য সংগ্রহের জন্য দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। এর আগে বুধবার দীপ সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফের মোটরসাইকেলের মেরামতের জন্য গ্যারেজে যান তারা। সেখান থেকে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় গিয়ে রাতের খাবার খান। সেখান থেকে দুজন নিজ নিজ মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন। উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকা পর্যন্ত একসঙ্গে ছিলেন। রাত ১২টার দিকে দুজন আলাদা হয়ে যান। এর পর দীপ নিজে বাসায় ফিরলেও তাহসিফের বিষয়ে আর কিছু জানেন না বলে দাবি করেছিলেন। 
তবে পিবিআইর তদন্তে উঠে আসে, দীপ তাঁর মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরেছেন মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে। রেস্তোরাঁ থেকে তারা একসঙ্গে তুরাগ নদের পারে গিয়েছিলেন– এটা প্রথমে গোপন করেন দীপ। 

যে বর্ণনা দিচ্ছেন দীপ 
দীপকে নিয়ে গতকাল দুপুর ১টার দিকে টঙ্গীর হোন্ডা রোড, হাজী মাজার বস্তিসংলগ্ন ইজতেমার মাঠ ও সেখানে সংলগ্ন তুরাগ নদে যায় পিবিআই ও নৌ পুলিশ। 
পুলিশ জানায়, দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন ঘটনাস্থলে তারা দুজন কথা বলছিলেন। এ সময় ইউনিফর্ম পরা দুজন লোক তাদের ধাওয়া করেন। তখন তাহসিফ দৌড় দেন। তবে দীপ হেঁটে হেঁটে তুরাগ নদের ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে নিজেকে আড়াল করেন। এক পর্যায়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। 

পিবিআই কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, এলাকাটি মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিত হওয়ায় ধাওয়াকারীরা নিরাপত্তাকর্মী বা মাদক ব্যবসায়ী হতে পারে। তাদের ধাওয়ায় তাহসিফ নদীতে পড়ে ডুবে যেতে পারেন। পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দীপের বক্তব্যে তারা এখনও পুরোপুরি আশ্বস্ত নন। তাঁর দেওয়া তথ্যসহ মামলার অন্যান্য দিক বিবেচনায় তদন্ত চলছে।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপ নানা তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান। গতকাল সাংবাদিকদের এনায়েত হোসেন বলেন, ‘ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিরা কারা, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলটি খোলা মাঠ এবং এর তিনদিকেই নদী। ঘটনাসংশ্লিষ্ট অনেক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কিছু ফুটেজ বিভ্রান্তিকর হওয়ায় সেগুলোসহ প্রযুক্তিগত তথ্য ও দীপের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তারা মাদকাসক্ত ছিল কিনা, তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। দীপ অনেক কিছু বলেছে, আমরা সবকিছু যাচাই-বাছাই করছি।’

ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে
তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে সাঁতার জানতেন এবং পাইলট প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে বিশেষ সাঁতার কোর্স সম্পন্ন করে সনদও পেয়েছিলেন। তাই দীপের দেওয়া ‘ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার’ বক্তব্য তিনি বিশ্বাস করছেন না। গতকাল সমকালকে তিনি বলেন, তাহসিফকে ধাওয়া করার কোনো কারণ নেই। তাঁর ভাষায়, ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ভয়ে দৌড় দেবে– এটা হাস্যকার না!

এনায়েতুল করিম বলেন, ‘মামলার ব্যাপারে আমরা এখনও ভাবিনি। আমরা পারিবারিকভাবে আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত নেব। তবে মামলার কেন প্রয়োজন হবে? সরকার নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে এবং অত্যন্ত আন্তরিক হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে মামলা মানেই তো ঝামেলা, কোর্টে দৌড়াদৌড়ি। কে চায় এই ঝামেলার মধ্যে পড়তে? যেখানে আমাদের চমৎকার সরকার রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে আমি ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছি, তারা অত্যন্ত দায়িত্ববান এবং সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।’
তাহসিফের ছোট্ট ব্যবসাটি দীপ দেখাশোনা করতেন বলে জানান কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি বলেন, অন্য চাকরি করায় ছেলের ব্যবসা দেখাশোনার দায়িত্ব পড়েছিল দীপের ওপর। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন কোম্পানিতে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের কাজটি দেখতেন। এ কারণে দীপের সঙ্গে তাহসিফের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিল।

আরও পড়ুন

×