ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ক্যান্সার রোগী ও পরিচর্যাকারীদের মনোসামাজিক সহায়তায় সামাজিক উদ্যোগের আহ্বান

ক্যান্সার রোগী ও পরিচর্যাকারীদের মনোসামাজিক সহায়তায় সামাজিক উদ্যোগের আহ্বান
×
×

ছবি: সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:১৭

ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি, রোগ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তি (সারভাইভার) ও তাদের পরিচর্যাকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সমাজের প্রতিটি স্তরে সাইকো-সোশ্যাল ইকোলজিক্যাল মডেল গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা শুধু শারীরিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; রোগীর মানসিক ও মনোসামাজিক চাহিদাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য পরিবার, সমাজ, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

শুক্রবার বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর. সি. মজুমদার মিলনায়তনে সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের (সিসিসিএফ) উদ্যোগে ‘Psychological Support for Cancer Patients, Survivors and Caregivers’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি, ক্যান্সার সারভাইভার ও তাদের পরিচর্যাকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রয়াত ক্যান্সার লড়াকুদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিসিসিএফের প্রেসিডেন্ট রোকশানা আফরোজ। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সানজিদা আখতার, আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডা. নাদিয়া ফারহীন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রভাষক লিজা আক্তার।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিসিসিএফের প্রেসিডেন্ট রোকশানা আফরোজ। আলোচক হিসেবে অংশ নেন সিসিসিএফের নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. এ. জে. ফয়সেল, মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক কোচ এবং জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ডা. ইতুকি চাকমা এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কাউন্সেলর ও সমন্বয়ক শামী সুরিদ।

মূল প্রবন্ধে রোকশানা আফরোজ ক্যান্সার চিকিৎসাকে শুধু শারীরিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রোগীর মানসিক ও মনোসামাজিক চাহিদাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্যান্সার নির্ণয়ের পর রোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা ভয়, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, আর্থিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে যেতে পারেন। চিকিৎসার প্রতিটি পর্যায়ে তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং পরিচর্যাকারীদের সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি ক্যান্সারসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় এবং এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পেশাজীবী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সিসিসিএফের নির্বাহী কমিটির সদস্য জ্যেষ্ঠ ডা. আবু জামিল ফয়সাল তার বক্তব্যে ক্যান্সারসেবায় চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনার পাশাপাশি মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও পারিবারিক পরিস্থিতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত। রোগী ও পরিচর্যাকারীরা যেন প্রয়োজনের সময় নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং উপযুক্ত সহায়তা পান, সে জন্য স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও সহায়তামূলক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন।

মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক কোচ এবং জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী ডা. ইতুকি চাকমা তার বক্তব্যে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা, মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, রোগী ও পরিচর্যাকারীদের মানসিক অবস্থার পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা, তাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং সহায়তা চাওয়াকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং অ্যান্ড ওয়েলনেস সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কাউন্সেলর ও সমন্বয়ক শামী সুরিদ তার বক্তব্যে কাউন্সেলিংয়ের ভূমিকা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানসিক সংকটে থাকা ব্যক্তির কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, বিচারহীনভাবে তার অনুভূতি গ্রহণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত পেশাদার সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিচর্যাকারীদের জন্য সহজলভ্য, গোপনীয়তা-সম্মত ও ধারাবাহিক কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

আহ্ছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ার ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডা. নাদিয়া ফারহীন তার বক্তব্যে বলেন, ক্যান্সার রোগীর যন্ত্রণা শুধু শারীরিক নয়; এর সঙ্গে মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক কষ্টও জড়িত। তাই রোগীর সামগ্রিক সুস্থতার জন্য সমন্বিত চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, সহমর্মিতাপূর্ণ যোগাযোগ এবং পারিবারিক ও সামাজিক সমর্থন নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি রোগীর পাশাপাশি পরিচর্যাকারীদের মানসিক ও আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেন।

বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক ক্যান্সার রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সংবেদনশীল ভাষা ও সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, রোগীকে কীভাবে ক্যান্সার নির্ণয়ের খবর জানানো হবে এবং তার সঙ্গে কী ধরনের ভাষায় কথা বলা হবে, তা রোগীর মানসিক অবস্থা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে নির্ধারণ করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার রোগীর কাছ থেকে রোগের তথ্য গোপন রাখতে চায়, যা চিকিৎসকদের জন্য একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। তিনি আরও বলেন, ক্যান্সার ব্যবস্থাপনা শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে মানসিক, সামাজিক ও নীতিগত বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। তার মতে, রোগীকে সম্মানজনকভাবে তথ্য দেওয়া, যথাযথ মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং চিকিৎসাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও সেন্টার ফর জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরিচালক ড. সানজিদা হক নিজের ক্যান্সার সারভাইভার সন্তানের মা হিসেবে অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্যান্সার রোগীর পাশাপাশি পরিচর্যাকারীদের মানসিক সহায়তাও অত্যন্ত জরুরি। অস্ট্রেলিয়ায় মেয়ের চিকিৎসাকালীন অভিজ্ঞতা থেকে তিনি পারিবারিক সমর্থন, অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি, মিউজিক থেরাপি এবং পরিচর্যাকারীদের বিশ্রামের সুযোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসার প্রক্রিয়া সহজ করা, রোগী ও পরিচর্যাকারীদের প্রয়োজন বোঝা এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা আরও কার্যকর করা সম্ভব।

এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রভাষক লিজা আক্তার সেমিনারে বক্তব্য রাখেন। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সিসিসিএফের নির্বাহী সদস্য মো. তরিকুল ইসলাম লিটন এবং হৃদিয়া আফরোজ রাকা। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সিসিসিএফের আজীবন সদস্য ডা. এস. এম. শহীদুল্লাহ।

সেমিনারে ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, সারভাইভার ও তাদের পরিচর্যাকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য করা, চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে মনোসামাজিক সহায়তার সমন্বয় এবং পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সিসিসিএফ বিশ্বাস করে, ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ে চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক শক্তি, সহমর্মিতা ও সামাজিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যেই সংগঠনটি ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, সারভাইভার ও তাদের পরিবারের পাশে থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

উল্লেখ্য, সেন্টার ফর ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশন (সিসিসিএফ) একটি স্বেচ্ছাসেবী ও অলাভজনক সামাজিক সংগঠন। সংগঠনটি ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, সারভাইভার ও তাদের পরিবারের সহায়তায় বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। সিসিসিএফ সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে নিবন্ধিত।

আরও পড়ুন

×