গানে ও স্মৃতিতে সাধক হালিম বয়াতি, জন্মশতবার্ষিকীর অপেক্ষা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ২২:০৬
কেউ গানে স্মরণ করলেন, কেউ বললেন তার সঙ্গে কাটানো দিনের কথা। কেউ তুলে ধরলেন সংগীতসাধনার অজানা অধ্যায়, কেউ আবার তার জীবন ও কর্মের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানালেন। গান, আলোচনা ও স্মৃতিচারণে এভাবেই ফিরে এলেন বিচার গানের সম্রাট, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাধক আবদুল হালিম বয়াতি।
লোকসংগীতের সাধনায় জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন তিনি। গানের মধ্য দিয়ে তুলে ধরেছেন মানুষের জীবনবোধ, দর্শন ও মরমি ভাবনা। আজ তিনি নেই, তবে তার গান ও সংগীতসাধনার উত্তরাধিকার ছড়িয়ে আছে শিষ্য, ভাবশিষ্য, অনুসারী ও সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে। সেই উত্তরাধিকার স্মরণ এবং শিল্পীর জীবন ও কর্মকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার প্রত্যয়ে অনুষ্ঠিত হলো ‘হালিম বয়াতি স্মরণোৎসব-২০২৬’।
আবদুল হালিম বয়াতির ৯৭তম জন্মবর্ষ উপলক্ষে শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পায়রা চত্বরে বসে এই আয়োজন। বিকেল চারটার দিকে শুরু হওয়া অনুষ্ঠান চলে রাত প্রায় ১০টা পর্যন্ত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লোকসংগীতশিল্পীদের পরিবেশনায় গান আর স্মৃতিচারণে মুখর হয়ে ওঠে আয়োজনস্থল।
স্মরণোৎসবে সংগীত পরিবেশন করেন আলেয়া বেগম, ফকির আবুল সরকার, লতা দেওয়ান, রুমা সরকার, মুক্তা সরকার, সৈয়দ আশিকুর রহমান, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, বগা তালেব, আকাশ গায়েন, শাহ মোহাম্মদ শিপন, মারুফ মৃন্ময়, খোকন চিশতি, সোহাগ প্রামাণিক, জয়িতা অর্পা, সানজিদা প্রমি, ইমরান হোসাইন, অভিবাঁদন দাস, নবীন কিশোর গোস্বামী, নাজমুল সরকার নিহাত, রহমান জনি, মনিরুজ্জামান খান, মাল সালমান ও মাহাবুব খালাসী। তাঁদের পরিবেশনায় লোকগানের নানা ধারা ও সুরের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় এই সাধককে।
গানের পাশাপাশি আবদুল হালিম বয়াতির জীবন, সংগীতসাধনা ও সাংস্কৃতিক অবদান নিয়ে আলোচনা করেন আলোকচিত্রী ও গবেষক নাসির আলী মামুন, লেখক ও গবেষক শফিকুর রহমান চৌধুরী, ড. তপন বাগচী এবং ড. সাইমন জাকারিয়া।
আলোচনায় নাসির আলী মামুন বলেন, আবদুল হালিম বয়াতির জীবন ও কর্মের অনেক কিছুই এখনো অনাবিষ্কৃত। তার একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী প্রকাশের আগে শিল্পীকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন- এমন মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা জরুরি। লাল মিয়া বয়াতিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা তাঁর শিষ্য, ভাবশিষ্য, অনুসারী ও পরিবারের সদস্যদের মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এসব স্মৃতির মধ্য দিয়ে হালিম বয়াতির জীবনের অনেক অজানা অধ্যায় সামনে আসতে পারে বলে মনে করেন এই গবেষক।
নাসির আলী মামুন জানান, হালিম বয়াতির ছেলে নিশানে হালিম বাবার জীবনী লেখার উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে তাড়াহুড়ো করে তা প্রকাশ না করে আরও দুই-তিন বছর সময় নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, ২০২৯ সালে হালিম বয়াতির জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা তার ভাবশিষ্য, অনুসারী ও সংগীতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একত্র হবেন। এর আগে প্রয়োজনীয় তথ্য, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা গেলে শিল্পীর জীবনী আরও পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠবে।
স্মৃতিচারণ পর্বে হালিম বয়াতির সঙ্গে কাটানো সময় এবং তার কাছ থেকে সংগীতশিক্ষার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন দুই শিষ্য লাল মিয়া বয়াতি ও নজরুল বয়াতি। শিল্পীর ছেলে নিশানে হালিমও বাবাকে ঘিরে নিজের স্মৃতির কথা বলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গবেষক মফিদুল হক।
একজন সাধকের জীবন কেবল তার গানের কথায় কিংবা সুরে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার চিন্তা, দর্শন, জীবনযাপন ও শিষ্যদের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেও ছড়িয়ে থাকে সময়ের নানা ইতিহাস। আবদুল হালিম বয়াতিকে ঘিরে এই স্মরণোৎসব সেই ইতিহাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি তার সংগীত-উত্তরাধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
গান ও স্মৃতির মধ্য দিয়ে সাধককে স্মরণ করার এই আয়োজন করে ‘হারিকেন’। আয়োজকদের প্রত্যাশা, ২০২৯ সালে তার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে হালিম বয়াতির জীবন, সাধনা ও সংগীতকর্ম আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব হবে।