বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব
যুক্তির আলোয় বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ার প্রত্যয়
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৪৭
প্রযুক্তির এই সময়ে তথ্যের অভাব নেই। হাতের মুঠোয় থাকা মুঠোফোনে মুহূর্তেই পাওয়া যাচ্ছে নানা বিষয়ে অসংখ্য তথ্য। কিন্তু কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোন তথ্যের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি- তা বুঝে নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম। আর সেই প্রজন্ম গড়ে তোলার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হতে পারে বিজ্ঞানচর্চা ও বিতর্ক।
বিতর্কের মঞ্চে যখন শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে যুক্তি তুলে ধরে, তখন শুধু জয়-পরাজয়ের লড়াই হয় না; তৈরি হয় প্রশ্ন করার সাহস, ভিন্নমতকে বোঝার মানসিকতা এবং যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। এমনই এক প্রত্যয় নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের ঢাকা বিভাগীয় পর্ব।
শুক্রবার রাজধানীর পান্থপথে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল একাডেমিতে দিনব্যাপী এ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’। আট জেলার চ্যাম্পিয়ন দল অংশ নেয় এ প্রতিযোগিতায়। বিতর্কের বিষয়বস্তু, শিক্ষার্থীদের যুক্তি উপস্থাপন এবং অতিথিদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ গঠনের প্রয়োজনীয়তা।
অনুষ্ঠানের অতিথিরা মনে করেন, শুধু পাঠ্যবইয়ে বিজ্ঞানের বিষয় পড়লেই বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া যায় না। প্রয়োজন বিজ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা, প্রশ্ন করতে শেখা এবং যুক্তির মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর অভ্যাস গড়ে তোলা। তবে এ পথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত উপকরণ ও ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব বড় বাধা হয়ে রয়েছে। সম্মিলিত উদ্যোগে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার আহ্বান জানান তারা।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাখহরি সরকার বলেন, বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে যুক্তিতর্ক থাকলেও নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিজ্ঞানকে ধারণ করতে হবে। বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার পাশাপাশি যৌক্তিকভাবে সঠিক পথ বেছে নেওয়া জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান চর্চার জন্য পর্যাপ্ত উপকরণ ও ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।
বিএফএফের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানভীতি দূর করে বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। বিতর্কের আসরে দর্শকসংকট থাকলেও এ চর্চা তরুণদের মধ্যে যুক্তিবাদী মানসিকতা তৈরি করছে। সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, স্বেচ্ছাসেবী বিচারক, শিক্ষক, অভিভাবক ও পৃষ্ঠপোষকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের এ উদ্যোগ আরও এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সমকালের সহকারী সম্পাদক সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম বর্তমান প্রজন্মের বিতর্কচর্চার সঙ্গে নিজের সময়ের অভিজ্ঞতার তুলনা করেন। তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকে সাদাকালো বিটিভিতে সপ্তাহে এক দিন বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতার আয়োজন হতো। তখন নানা অজুহাতে অনেকেই এসব অনুষ্ঠান এড়িয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম অনেক এগিয়ে গেছে।
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম বলেন, প্রযুক্তির যুগে সত্য ও মিথ্যার ব্যবধান যখন অত্যন্ত সূক্ষ্ম, তখন সঠিক তথ্য গ্রহণ এবং যুক্তির মাধ্যমে সত্যকে সামনে এগিয়ে নিতে বিতর্ক অত্যন্ত জরুরি। ইউটিউব দেখে অনেক কিছু শেখা গেলেও বিতর্কের দক্ষতা অর্জন করতে হয় যুক্তি ও অনুশীলনের মাধ্যমে। মফস্বল থেকে উঠে আসা তরুণদের যুক্তিনির্ভর চর্চা আগামীর সুন্দর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী করে।

আট জেলার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ
বিএফএফ ও সমকালের যৌথ উদ্যোগে এবং সমকালের পাঠক সংগঠন সুহৃদ সমাবেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের ১২তম আসর। এবারের উৎসবের পাওয়ার্ড বাই স্পন্সর শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি।
ঢাকা বিভাগীয় পর্বে ঢাকা বিভাগ-১-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে শরীয়তপুরের মজিদ জরিনা ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। রানার্সআপ হয়েছে চাঁদপুরের মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিযোগিতায় সেরা বিতার্কিক নির্বাচিত হয়েছে চ্যাম্পিয়ন দলের বিদ্যা দেবনাথ। দলের অন্য দুই সদস্য নাবিলা হক তুশি ও মুশফিকা ইসরাক মেরি।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে দলটি ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অন্য দলগুলো হলো নরসিংদীর ব্রাহ্মন্দী কামিনী কিশোর মৌলিক সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উচ্চ বিদ্যালয়, ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকগঞ্জ সরকারি সুরেন্দ্র কুমার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মাদারীপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং গোপালগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।
সমাপনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের গণসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল কাদের এবং কৃতি বিতার্কিক ও প্রশিক্ষক মাজেদ আজাদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকাল সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক আসাদুজ্জামান।
প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন কৃতি বিতার্কিক পিয়াস মাহমুদ, এম মেহেদী হাসান, আজম খান, কাজী সীমান্ত, নাদিয়া রহমান, রিমা আহমেদ, আল আমিন, মেহেদী হাসান, এ এস এম শাহরিয়ার সিদ্দিকী, হাসিব, লামিসা, সিয়াম হাসান, জান্নাতুল নাইমা, আলভী তনয়, আব্দুর রহমান, নাবিলা, আবু সালেহ মুসা, রোকসানা মিতু ও রোকসানা আক্তার।
বিতর্কের মঞ্চে শিক্ষার্থীদের এই অংশগ্রহণ কেবল একটি প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন, যুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তার চর্চার মধ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন এক প্রজন্মের ভিত। যে প্রজন্ম তথ্যকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে যাচাই করতে শিখবে, ভিন্নমতকে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করবে এবং জীবনের নানা সিদ্ধান্তে বিজ্ঞানমনস্কতার পরিচয় দেবে- এমন প্রত্যাশাই আয়োজক ও অতিথিদের।
- বিষয় :
- বিতর্ক উৎসব
- প্রতিযোগিতা
- সমকাল
- বিজ্ঞান
- প্রযুক্তি