ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ভূতুড়ে পোশাক, কুমড়া আর ‘ট্রিক অর ট্রিট’: যেভাবে শুরু হ্যালোইন

ভূতুড়ে পোশাক, কুমড়া আর ‘ট্রিক অর ট্রিট’: যেভাবে শুরু হ্যালোইন
×
×

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ২১:০৭

ভূত, ডাইনি, কঙ্কাল কিংবা ভ্যাম্পায়ারের সাজে রাস্তায় নামা, বাড়ির সামনে কুমড়ার ভেতর আলো জ্বালিয়ে রাখা, আর প্রতিবেশীদের দরজায় গিয়ে ‘ট্রিক অর ট্রিট’ বলে মিষ্টি চাওয়া- এসবই হ্যালোইনের পরিচিত দৃশ্য। প্রতিবছর ৩১ অক্টোবর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা আয়োজনে পালিত হয় উৎসবটি। সময়ের সঙ্গে প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচার থেকে বেরিয়ে হ্যালোইন এখন পরিণত হয়েছে আনন্দ, বিনোদন ও সামাজিক মিলনমেলার আয়োজনে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আয়ারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যে হ্যালোইন বেশ জনপ্রিয়। উৎসবটি ঘিরে সাজসজ্জা, বিশেষ পোশাক, মিষ্টি ও নানা অনুষঙ্গের বড় বাজারও তৈরি হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশেও হ্যালোইন উদ্‌যাপনের আয়োজন চোখে পড়ছে।

হ্যালোইন নামের উৎপত্তি কোথায়?
হ্যালোইন শব্দটি এসেছে ‘অল হ্যালোজ ইভ’ থেকে। খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে ১ নভেম্বর পালিত হয় অল সেইন্টস ডে বা সব সাধু দিবস। এর আগের সন্ধ্যাকে বলা হতো অল হ্যালোজ ইভ। সময়ের সঙ্গে এই নাম সংক্ষিপ্ত হয়ে ‘হ্যালোইন’ হয়েছে।

তবে উৎসবটির শিকড় আরও প্রাচীন। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে ইউরোপের কেল্টিক জনগোষ্ঠীর ‘সামহেইন’ উৎসবের সঙ্গে হ্যালোইনের উৎপত্তির সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে কেল্টিকরা এই উৎসব পালন করতেন।

কেল্টিক বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, ১ নভেম্বর ছিল নতুন বছরের শুরু। এর আগের দিন অর্থাৎ ৩১ অক্টোবর পালিত হতো সামহেইন। এ সময় ফসল তোলার মৌসুম শেষ হতো এবং শীতের সূচনা ঘটত।

মৃতদের আত্মা নিয়ে প্রাচীন বিশ্বাস
কেল্টিকদের বিশ্বাস ছিল, বছরের এই বিশেষ সময়ে জীবিত মানুষ ও মৃতদের জগতের মধ্যকার সীমারেখা অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে মৃত স্বজনদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে এসে পরিবারের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।

তবে আত্মাদের এই আগমনকে সবাই স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতেন না। অশুভ আত্মার হাত থেকে রক্ষা পেতে সন্ধ্যার পর খোলা জায়গায় বড় আগুন জ্বালানো হতো। অনেকে আবার ভূতুড়ে পোশাক পরে ছদ্মবেশ ধারণ করতেন, যাতে আত্মারা তাদের জীবিত মানুষ হিসেবে চিনতে না পারে।

প্রাচীন এই বিশ্বাস ও রীতির সঙ্গে পরবর্তী সময়ে খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য যুক্ত হয়। এভাবেই সামহেইনের নানা উপাদান এবং অল সেইন্টস ডের আগের সন্ধ্যার আনুষ্ঠানিকতা মিলিয়ে হ্যালোইনের বর্তমান রূপ গড়ে ওঠে।

আয়ারল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইন
হ্যালোইনের প্রচলিত রীতিগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের লোককথা ও ঐতিহ্যের যোগ রয়েছে। উনিশ শতকে দুর্ভিক্ষসহ নানা কারণে আইরিশ জনগোষ্ঠীর অনেকে দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অভিবাসী হন। তাদের সঙ্গে হ্যালোইন উদ্‌যাপনের রীতিও ছড়িয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর উৎসবটিতে নতুন নতুন আয়োজন যুক্ত হয়। বিশেষ করে কুমড়া খোদাই করে ভৌতিক মুখ তৈরি এবং তার ভেতরে আলো জ্বালানোর রীতি জনপ্রিয়তা পায়। পরে সিনেমা, টেলিভিশন ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির মাধ্যমে হ্যালোইন বিশ্বের নানা প্রান্তে পরিচিত হয়ে ওঠে।

কুমড়ার ভেতর আলো জ্বালানোর গল্প
হ্যালোইনের অন্যতম পরিচিত প্রতীক জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন। এ রীতিতে বড় মিষ্টিকুমড়ার ভেতরের নরম অংশ ও বিচি বের করে ফেলা হয়। এরপর কুমড়ার গায়ে চোখ, নাক ও মুখের আকৃতি খোদাই করে ভেতরে ছোট আলো বা মোমবাতি রাখা হয়।

এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘স্টিঞ্জি জ্যাক’ নামের এক লোককথা। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, জ্যাক শয়তানকে বোকা বানিয়েছিলেন। পরে অভিশপ্ত হয়ে তাকে জ্বলন্ত কয়লা হাতে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াতে হয়। আলো বহনের জন্য তিনি খোদাই করা শালগম ব্যবহার করতেন।

আয়ারল্যান্ডে একসময় শালগম দিয়েই এ ধরনের লণ্ঠন তৈরি করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীরা যাওয়ার পর সেখানে সহজে খোদাই করা যায় বলে শালগমের পরিবর্তে কুমড়া ব্যবহার শুরু করেন। সেই থেকে কুমড়া হ্যালোইনের অবিচ্ছেদ্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

‘ট্রিক অর ট্রিট’ ও ভৌতিক পোশাক
হ্যালোইনের সবচেয়ে জনপ্রিয় আয়োজনগুলোর একটি ‘ট্রিক অর ট্রিট’। শিশুরা ভূত, ডাইনি, কঙ্কাল কিংবা নানা কাল্পনিক চরিত্রের পোশাক পরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যায়। দরজায় গিয়ে তারা বলে, ‘ট্রিক অর ট্রিট’। বিনিময়ে বাড়ির লোকজন তাদের মিষ্টি, চকলেট বা ক্যান্ডি দেন।

এ ছাড়া হ্যালোইনে ভৌতিক পোশাক পরার প্রচলন রয়েছে। ভূত, ডাইনি, ভ্যাম্পায়ার, কঙ্কাল ও দানবের পাশাপাশি বর্তমানে সুপারহিরো কিংবা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের চরিত্রের সাজেও অনেকে অংশ নেন।

বড়দের জন্য আয়োজন করা হয় থিমভিত্তিক পার্টি। কোথাও কোথাও তৈরি করা হয় ‘হন্টেড হাউস’ বা ভুতুড়ে বাড়ি, যেখানে দর্শনার্থীরা ভৌতিক পরিবেশের অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। হরর সিনেমা দেখা, বিভিন্ন খেলা এবং সাজসজ্জার প্রতিযোগিতাও থাকে উৎসবের অংশ।

ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বিনোদনের উৎসব
একসময় হ্যালোইনের সঙ্গে আত্মা, মৃত্যু ও অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের সম্পর্ক ছিল গভীর। আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেনের বিভিন্ন অঞ্চলে এ সময় আগুন জ্বালানো, খেলাধুলা, ভবিষ্যৎ গণনা এবং নানা লোকাচার প্রচলিত ছিল। পরবর্তী সময়ে এসব রীতির কিছু পরিবর্তিত হয়েছে, কিছু হারিয়ে গেছে; আবার যুক্ত হয়েছে আধুনিক বিনোদনের নানা আয়োজন।

বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশে হ্যালোইন মূলত আনন্দ ও বিনোদনের উৎসব হিসেবে পালিত হয়। শিশুদের ক্যান্ডি সংগ্রহ, কুমড়া সাজানো, ভৌতিক পোশাক পরা কিংবা পার্টিতে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই দিনটি উদ্‌যাপন করেন অনেকে।

সূত্র: বিবিসি ও এনডিটিভি

আরও পড়ুন

×