ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে তিন জিনের সম্পর্ক পেয়েছেন গবেষকরা

উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে তিন জিনের  সম্পর্ক পেয়েছেন গবেষকরা
×
×

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম 

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:০৭ | আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের ২২২ জনের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত তিনটি জিনের বহুরূপতা শনাক্ত করেছেন একদল গবেষক। এর মধ্যে একটি জিনের বিশেষ পরিবর্তন নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। শহরে বসবাসকারী নারী এবং অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের মধ্যে এ পরিবর্তনের উপস্থিতি বেশি। 

ৎগবেষকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি নির্ধারণে জিনগত বৈশিষ্ট্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
‘দক্ষিণ বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে বিভিন্ন জিনের বহুরূপতার সম্পর্ক’ শীর্ষক গবেষণাটি গত বুধবার নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ারের জিন রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। 

গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ১০৬ জন এবং স্বাভাবিক রক্তচাপের ১১৬ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ছয়টি চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে।
গবেষণায় তিনটি জিনের বহুরূপতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো হলো এন্ডোথেলিন-১, এন্ডোথেলিন-কনভার্টিং এনজাইম-১ এবং অ্যাঞ্জিওটেনসিনোজেন। গবেষকদের মতে, এসব জিনের নির্দিষ্ট কিছু পরিবর্তনের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে।
গবেষণায় ইসিই১ জিনের সি-৩৩৮ এ নামের একটি বিশেষ পরিবর্তনের উপস্থিতি নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এই পরিবর্তন শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী এবং ৪০ শতাংশ পুরুষ। পরিবর্তন শনাক্ত হওয়া নারীদের ৫৮ শতাংশ শহরের বাসিন্দা। বাকি ৪২ শতাংশ গ্রামের।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তাদের মধ্যে কোলেস্টেরলের মাত্রাও তুলনামূলক বেশি ছিল।

বয়স, খাদ্যাভ্যাস ও তামাকের ব্যবহার
গবেষণায় অংশ নেওয়া উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের গড় বয়স ছিল ৫২ বছর। স্বাভাবিক রক্তচাপের ব্যক্তিদের গড় বয়স ৪৪ বছর। আক্রান্ত ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতাও তুলনামূলক কম। তাদের ৫৮ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন। এ ছাড়া ৫৮ শতাংশের মাসিক পারিবারিক আয় ২০ হাজার টাকার নিচে।
উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪০ শতাংশ বর্তমানে কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ধূমপান ও জর্দা ব্যবহার রয়েছে। আগে তামাক ব্যবহার করতেন, বর্তমানে করেন না– এমন ব্যক্তির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ রোগী সপ্তাহে তিনবারের বেশি প্রক্রিয়াজাত খাবার খান। এসব তথ্য থেকে গবেষকরা মনে করছেন, জিনগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি বয়স, ওজন, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার বিষয়গুলোও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

জিনগত বিশ্লেষণে নতুন সম্ভাবনা
গবেষকরা জানান, এ গবেষণায় আধুনিক হোল এক্সোম সিকোয়েন্সিং (ডব্লিউইএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের জিনোমের প্রোটিন তৈরির নির্দেশনাসংবলিত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিশ্লেষণ করা যায়। এর সাহায্যে রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা সম্ভব।
গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক এস এম রফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক আদনান মান্নান। গবেষক দলে আরও ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের হরমোন ও ডায়াবেটিস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফারহানা আক্তার, রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজি বিভাগের মাসুদ রানা, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও গবেষক।

গবেষক অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, এন্ডোথেলিন-কনভার্টিং এনজাইম-১ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম। এটি এন্ডোথেলিন-১ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এন্ডোথেলিন-১ রক্তনালি সংকুচিত করে। এতে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ইসিই১ জিনের সি-৩৩৮এ পরিবর্তন রক্তচাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় নারীদের মধ্যে এই পরিবর্তনের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। যাদের মধ্যে পরিবর্তনটি শনাক্ত হয়েছে, তাদের অধিকাংশের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। তাদের কোলেস্টেরলের মাত্রাও তুলনামূলক বেশি ছিল।
অধ্যাপক ফারহানা আক্তার বলেন, উচ্চ রক্তচাপ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। সাধারণত অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাকে এর প্রধান ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও নিয়মিত ওষুধ সেবনের পরও অনেকের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়। এর পেছনে জিনগত পরিবর্তনের ভূমিকা থাকতে পারে।
গবেষক মাসুদ রানা বলেন, জিনগত বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা নির্ধারণের পদ্ধতিকে বলা হয় প্রিসিশন মেডিসিন। ভবিষ্যতে এ পদ্ধতি উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন, গবেষণায় স্বাভাবিক রক্তচাপের ব্যক্তিদের 
মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু জিনগত পরিবর্তন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এসব পরিবর্তন বহন করলেই যে কেউ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হবেন, তা নয়। পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও অন্যান্য জৈবিক বিষয়ও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

আরও পড়ুন

×