সম্পদের পাহাড় সাবেক মিটার রিডার শহীদুলের
শহীদুল ইসলাম
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ১৪:৩৫ | আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ১৪:৫২
ছিলেন ঢাকা ওয়াসার মিটার রিডার, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। পদোন্নতি পেয়ে হয়েছিলেন মিটার ইন্সপেক্টর, এখন অবসরে। ওয়াসা সিবিএর দাপুটে নেতাও ছিলেন এক সময়। রাজধানীর খিলগাঁও থানার নন্দীপাড়া এলাকার বাসিন্দা সেই সাবেক মিটার রিডার শহীদুল ইসলামই এখন নামে-বেনামে শতশত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নিজের এবং স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নামে রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি, প্লট ও কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স। কুমিল্লার নিজ গ্রামেও রয়েছে বিলাসবহুল বাড়ি ও কোটি টাকার সম্পদ। প্রতারণা, সন্ত্রাস ও দখলবাজিতেও জুড়ি নেই তার।
এলাকাবাসী বলছেন, সম্পদের পাহাড় গড়তে এবং সন্ত্রাস-দখলবাজি নির্বিঘ্ন করতে সাবেক জামায়াত কর্মী শহীদুল ইসলাম স্থানীয় এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ও সন্ত্রাসী বাহিনীর সঙ্গে গড়ে তুলেছেন সখ্য। খিলগাঁও থানার ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহ আলম তার নিকটাত্মীয় হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গেও 'দহরম-মহরম' সম্পর্ক রয়েছে তার। এরাই অর্থের বিনিময়ে সব অপকর্মে সহযোগিতা দিচ্ছে তাকে। খিলগাঁও থানাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণা, সন্ত্রাস ও দখলবাজি-সংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) তার নামে অভিযোগ গেছে বহুবার। তবে অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় থানা পুলিশ ও প্রশাসনকে 'ম্যানেজ' রাখায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না।
এক সময়ের নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান শহীদুল ইসলাম ঢাকা ওয়াসার 'মিটার রিডার' ও পরে 'মিটার ইন্সপেক্টর' পদে দীর্ঘদিন চাকরির পর অবসরে যান ২০১৬ সালে। ওয়াসায় চাকরি করার সময়ই নামে-বেনামে সম্পদ বানাতে শুরু করেন তিনি। মিটারসহ ওয়াসার সংযোগে নানা দুর্নীতি করে এসব সম্পদ বানান। সিবিএ নেতার পরিচয়ে ওয়াসার বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে পাহাড়সম সম্পদের মালিক বনে যান। তবে 'সরকারি চাকরি' করার কারণে এবং দুদকের নজর ও মামলা-মোকদ্দমা এড়াতে বাড়ি ও প্লটের বেশিরভাগই করিয়েছেন স্ত্রী মাফিয়া বেগম, ছেলে শামসুল ইসলাম এবং তিন মেয়ে ইয়াসমিন বেগম, বিলকিস আক্তার বীণা ও সিনথিয়া ইসলামের নামে। একাধিক ব্যাংক হিসাবে কোটি কোটি টাকাও রয়েছে স্ত্রী-সন্তানদের নামে।
শহীদুল ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে যত সম্পদ: রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও থানার বাসাবো, নন্দীপাড়া, রামপুরা, বনশ্রী ও উত্তরা এবং কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার নিজ গ্রামে শহীদুল ও তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের নামে কমপক্ষে সাত-আটটি বিলাসবহুল বাড়ি ও ২০টি প্লট রয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রমাণপত্র সমকালের কাছেও রয়েছে।
সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শহীদুল বর্তমানে রাজধানীর খিলগাঁও থানার নন্দীপাড়ার ৩ নম্বর সড়কের ৭ নম্বর বাড়িটিতে সপরিবারে বসবাস করছেন। পাঁচ কাঠা জায়গার ওপর নির্মিত ছয়তলা ভবনের দুই ইউনিটের বাড়িটি শহীদুলের স্ত্রী মাফিয়া বেগমের নামে করায় বাড়িটির নাম রাখা হয়েছে 'মাফিয়া কটেজ'। বিলাসবহুল এই বাড়িটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এর পাশেই ১০ কাঠা জমির ওপর নিজের নামে বানিয়েছেন আরেকটি বাড়ি। সেখানে টিনশেড ঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। যার বাজারমূল্য ৭/৮ কোটি টাকা। নন্দীপাড়ার একই সড়কের ১০৩ নম্বর বাড়িটি তার তিন মেয়ে ইয়াসমিন বেগম, বিলকিস আক্তার বীণা ও সিনথিয়া ইসলামের নামে নির্মাণ করেছেন শহীদুল। 'বাগানবাড়ি'র আদলে নির্মিত বাড়িটির নাম দেওয়া হয়েছে 'তিন কন্যা নীড়'। প্রায় দেড় বিঘা জমির এই বাড়িটিতে কাঁচাপাকা ২৫টির মতো টিনের ঘর রয়েছে। এই বাড়িটির বাজারমূল্য ৩০ কোটি টাকারও বেশি।
নন্দীপাড়া প্রধান সড়কে পাঁচ কাঠা জমির ওপর আরও একটি বাড়ি রয়েছে শহীদুলের। বাড়িটির সামনে দোকান ও পেছনে টিনশেডের ঘর বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যার বাজারমূল্য ৫/৬ কোটি টাকা। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার নিজ গ্রামে একটি বিলাসবহুল বাড়ি ছাড়াও কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তার। এছাড়া খিলগাঁও ও উত্তরায় চারটি ফ্ল্যাটও রয়েছে শহীদুলের।
রামপুরা বনশ্রীর এইচ ব্লকের ৬ নম্বর সড়কে স্ত্রী মাফিয়া বেগম ও ছেলে শামসুল ইসলামের নামে সাত কাঠার দুটি প্লট (প্লট ১ ও ২) রয়েছে সাবেক এই মিটার রিডারের। যার বাজারমূল্য ৮ কোটি টাকা। খালি এই প্লটটি ভাড়া দেওয়া আছে মাসিক ৪৫ হাজার টাকায়। রামপুরা বনশ্রীর এইচ ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর বাড়ির দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে শহীদুলের এক মেয়ের নামে। তবে এই দুটি ফ্ল্যাট ভাড়া দিয়ে রেখেছেন শহীদুল। এছাড়া নন্দীপাড়া, রামপুরা বনশ্রী ও বাসাবো এলাকায় তার আরও ১৩টি প্লট রয়েছে।
সন্ত্রাস ও দখলবাজি: শহীদুল ইসলাম ও তার স্ত্রী মাফিয়া বেগমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে চার-পাঁচ দফায় অভিযোগপত্র জমা পড়েছে দুদকে। এরপরও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে খিলগাঁও থানাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণা ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে।
রামপুরা দক্ষিণ বনশ্রী এলাকার অজিয়ার রহমানের অভিযোগ, দক্ষিণ বনশ্রীতে শহীদুল ইসলামের ছেলে শামসুল ইসলামের নামে কেনা চার কাঠার প্লটটি ২০১৩ সাল থেকে লিজ নিয়ে সেখানে আটটি দোকান নির্মাণ ও সেগুলো ভাড়া দিয়েছিলেন তিনি। পরে শহীদুলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই সেখানে 'রিলায়েবল সুইমিং পুল' নামে সাঁতার শেখানোর একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পরিচালনা করে আসছিলেন। শহীদুল ইসলাম ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর তার নিকটাত্মীয় ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি শাহ আলম ও তার সন্ত্রাসী বাহিনীর সহযোগিতায় ওইসব দোকান ও সুইমিং পুল গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মালপত্র লুটে নিয়ে যান। এই দখল ও লুটপাটে স্থানীয় থানা পুলিশও শহীদুলকে সহযোগিতা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরও দুটি সন্ত্রাসের মামলায় পুলিশ টাকা খেয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অজিয়ার রহমান।
চাকরিরত অবস্থায়ও শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। ২০১৪ সালে রাজধানীতে অবৈধ পানির জার বাজারজাতের দায়ে দুই ব্যক্তিকে এক মাস করে কারাদ দিয়েছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। দোষীদের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট থাকার প্রমাণ পাওয়ায় সে সময় পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছিল তাকে।
'আত্মগোপনে' শহীদুল!: দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে কথা বলার জন্য তার খিলগাঁও থানার নন্দীপাড়ার 'মাফিয়া কটেজে' গিয়েও শহীদুল ইসলামের বক্তব্য জানা যায়নি। এই প্রতিবেদকসহ একটি টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার ওই বাসার সামনে গেলে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর বাসার দরজাও খোলেননি শহীদুল ও তার পরিবারের সদস্যরা। এর পরপর শহীদুল তার মোবাইল ফোন নম্বরটিও বন্ধ করে দেন, যা প্রায় ২০ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। পরে শহীদুলের জামাতা খোকনের নম্বরে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর কেটে দেন তিনিও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী জানিয়েছেন, দুদকে অভিযোগ দাখিলসহ এর আগে দু-একটি টিভি চ্যানেলে শহীদুলের অপকর্মের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে অনেকটাই আত্মগোপনে রয়েছেন সাবেক এই মিটার রিডার। সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলার পাশাপাশি নিজ বাসা ছেড়ে অন্যত্র রাত্রিযাপন করছেন তিনি।
- বিষয় :
- ঢাকা ওয়াসা
- শহীদুল ইসলাম
- মিটার রিডার
