ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল-সমকাল অনলাইন গোলটেবিল

নারী নির্যাতনকারীদের দলে আশ্রয় দেবেন না

নারী নির্যাতনকারীদের দলে আশ্রয় দেবেন না
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর ২০২০ | ১৪:৫২

মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন সংশোধন হলেও নারী ধর্ষণ ও নির্যাতন বন্ধ হয়নি; বরং আইন কার্যকরের পর ৪০ দিনে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে তিন গুণ। সহিংসতা বন্ধে নারীকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাে র মূলধারায় আনতে হবে। নারীকে দিতে হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার। নারী নিপীড়ক-ধর্ষককে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। কোনো দলে যেন নারী নির্যাতনকারীর জায়গা না হয়। তারা যেন ভোটে অংশ নিতে না পারে। দলে আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐক্য ও সদিচ্ছা। গতকাল সোমবার 'নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা' শীর্ষক অনলাইন গোলটেবিলে বক্তারা এসব কথা বলেছেন।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও সমকালের যৌথ আয়োজনে ইউএসএইড এবং ইউকেএইডের অর্থায়নে এই গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়। সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফির সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স, জাতীয় পার্টির যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোহাম্মদ রাজু, মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম ক্রিক, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক খন্দকার ফারহানা ইয়াসমিন আতিকা, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সিনিয়র ডেপুটি ডিরেক্টর নীনা গোস্বামী, কক্সবাজার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইউসুফ, শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-দপ্তর সম্পাদক বিনয় কুমার সাহা ও বাগেরহাট সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া পারভীন।

স্বাগত বক্তব্যে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ডেপুটি চিফ অব পার্টি লেজলি রিচার্ডস বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতার বিচার সবচেয়ে কম হয়। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা উন্নয়ন ও শান্তির প্রতিও হুমকি। করোনা মহাকারিকালে পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার কোটি ৩০ লাখ নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। নারী নির্যাতন বন্ধে ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ ঘোষিত ১৬ দিনের প্রচার কর্মসূচি চলছে। এ সময়ে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে নারীর প্রতি সহিংসতায় ইতি টানতে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চালাতে হবে।

আলোচনার শুরুতে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক লিপিকা বিশ্বাস। তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার। কিন্তু ধর্ষণের মতো সন্ত্রাসে দেখা যায়, অপরাধী ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় আশ্রয় খোঁজে। রাজনীতিবিদদের প্রতি আহ্বান থাকবে, ধর্ষক ও নারী নিপীড়ক যেন দলে জায়গা না পায়।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, নারী নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিকভাবে বয়কট করতে হবে। নারী নির্যাতন মামলায় আদালত কারও বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করলে তাদের যেন কোনো রাজনৈতিক দল কমিটিতে স্থান না দেয়, নির্বাচনে মনোনয়ন না দেয়। তিনি বলেন, শুধু কর্মসূচি ভিত্তিক কথাবার্তা নয়, সব সময় সবখানেই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। নারীবান্ধব সমাজ ও রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে হবে।

আওয়ামী লীগ নেতা আফজাল হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগে নারীর প্রতি সহিংসতার জায়গা নেই। নারীর উন্নয়নের নীতিতে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে নারী রাজনীতি ও অর্থনীতির মূলধারায় বেশি সম্পৃক্ত।

নারীর প্রতি সহিংসতায় অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে সম্পৃক্তদের সংশ্নিষ্ট থাকার কথা নয়; কিন্তু তারপরও অপরাধী অপরাধীই। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন সংশোধন হয়েছে।

আফজাল হোসেন বলেন, বিএনপি-জামায়াত মুখে যতই নারীর অধিকারের কথা বলুক, সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিলে নিপীড়ন বন্ধ হবে না। নারী নির্যাতন বন্ধে রাজনৈতিক ঐক্য হতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে। নইলে সহিংসতা বন্ধ হবে না।

বিএনপি নেতা ইমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, নারীর প্রতি সহিংসতা এখন মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। গণমাধ্যমে যেসব খবর আসছে, তাও প্রকৃত চিত্র নয়। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে বিএনপিকে ভোট দেওয়ায় একজন নারীকে ধর্ষণ করা হয়। সমাজে তৈরি হওয়া ক্ষোভ-বিক্ষোভকে সামাল দিতে ধর্ষণের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। তাতে ফল হয়নি। আইন পাসের পর ৪০ দিনে ধর্ষণ তিন গুণ বেড়েছে। বিএনপি আগেই বলেছিল, মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে লাভ হবে না।

তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ড অপরাধীর মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে পারেনি। দেশে সুশাসন, গণতন্ত্র, অবাধ রাজনৈতিক চর্চা, ধর্ম ও সংস্কৃতির চর্চা না থাকলে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়বেই। ধর্ষক ও নারী নিপীড়কদের কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে নেওয়া যাবে না। যারা ধর্ষককে প্রশ্রয় দেয়, মধ্যস্থতা করে তাদেরও দলে রাখা যাবে না। নির্বাচন কমিশন এ ধরনের আইন করলে বিএনপি তাতে সমর্থন দেবে।

জাতীয় পার্টির নেতা গোলাম মোহাম্মদ রাজু বলেন, রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই। চলে গেছে ধনী ও ব্যবসায়ীদের হাতে। রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে না ফিরলে অপকর্মকারীদের রাজনৈতিক দলে স্থান দেওয়া বন্ধ হবে না।

মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম ক্রিক বলেন, শুধু রাজনৈতিক কর্মী নয়, স্কুলের শিক্ষক থেকে মসজিদের ইমামও নারী নিপীড়নের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের কারও নাম আসার সঙ্গে সঙ্গে অপকর্মকারীদের বহিস্কার করা হচ্ছে। নারীকেও অধিকারের প্রশ্নে সচেতন হতে হবে। নারীরা এখন সর্বত্র অর্ধেক। কিন্তু গ্রামেগঞ্জে নারীরা সচেতন হয়নি। সেখানেও কাজ হচ্ছে, তবে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। নিপীড়ন, ধর্ষণ বন্ধে নারীদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

মহিলা দলের নেত্রী ফরহানা ইসলাম আতিকা বলেন, নারী নিপীড়ন বন্ধে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নারীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা শুধু মুখে মুখে রয়েছে। নারীকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যেখানেই হোক, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় নেই নারীরা।

পুলিশ কর্মকর্তা ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, সবচেয়ে বেশি নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার। এর পরেই রয়েছে ধর্ষণের মামলা। পুলিশ নারী নির্যাতনের মামলায় সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়। স্থানীয় প্রতিনিধিরা ভালোভাবে জানেন কে নারী নিপীড়নকারী, কে স্ত্রীকে মারধর করে, কে নারীকে উত্ত্যক্ত করে। তাদের কাছে যদি নারী যায়, তাহলে সমাজের প্রতিনিধিরা ভিকটিমকে উল্টো ভয় দেখাতে থাকে। একটি মেয়ে যদি স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে কিন্তু তার আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। তাই আইনের আশ্রয় নিতে পারে না।

তৃণমূলের রাজনীতির অভিজ্ঞতায় রিজিয়া পারভীন বলেন, আইন ও বিধিমালা রয়েছে। সমস্যা হলো ব্যাপক জনসচেতনতা নেই। যত আইনই থাকুক, পুরুষ যতদিন সচেতন না হবে ততদিন নির্যাতন বন্ধ হবে না। নারীকেও ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আইন সম্পর্কে জানতে হবে। অধিকার আদায়ের পথ জানতে হবে। বিনয় কুমার সাহা বলেন, করোনাকালে কর্মহীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ার তথ্য সঠিক। তবে সহিংসতা রোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে। আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, কক্সবাজার জেলা বিএনপি নারীর প্রতি সহিংসতাকারীদের দলে স্থান দেয় না।

আরও পড়ুন

×