ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের দিনরাত্রি
নতুন বসতিতে ওরা পেল রেশন ও গ্যাস
ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের হাতে রোববার রেশন তুলে দেওয়া হয়- সংগৃহীত
সাহাদাত হোসেন পরশ ভাসানচর (হাতিয়া) থেকে ফিরে
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:৩৯
নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরের নতুন ঠিকানায় সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছেন রোহিঙ্গারা। গতকাল রোববার তারা পেয়ে গেছেন রান্নার জন্য সিলিন্ডার গ্যাস। রান্নার পর গ্যাস ফুরিয়ে গেলে তা রিফিল করে দেওয়া হবে। ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে গতকালই রেশনও সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মরিচ, আলু, লবণ, মসলা থেকে শুরু করে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্র।
একাধিক রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল থেকে অনেকেই নিজেদের চুলায় রান্না শুরু করেছেন। শুক্রবার ভাসানচরে স্থানান্তরের পর প্রথম দিন তাদের তৈরি করা খাবার সরবরাহ করা হয়। সুন্দর পরিবেশ, পাকা ঘর, প্রশস্ত সড়ক ও মাঠে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকায় ভাসানচরে স্থানান্তর হওয়া রোহিঙ্গারা অত্যন্ত খুশি। মুক্ত পরিবেশে তারা আনন্দচিত্তে সেখানে অবস্থান করছেন। এরই মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থানরত তাদের স্বজন ও পরিচিতরা ভাসানচরের দৃশ্য দেখে দ্রুত সেখানে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। আবুল হাশেম নামে এক রোহিঙ্গা জানান, তিনি কক্সবাজার ক্যাম্পের একটি মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের নিয়ে ভাসানচরে চলে এসেছেন তিনি। রোহিঙ্গা হলেও প্রমিত বাংলায় কথা বলতে পারেন তিনি। হাশেম বলেন, ভাসানচরে এসে নতুন জীবন শুরু করছি। রেশন ও গ্যাস পাওয়ার পর শনিবার থেকে নিজেরা রান্না করে খাওয়ার বন্দোবস্তও করে ফেলেছি।
হাশেম বলেন, ভাসানচর আসার পর থেকে ফোনের রিংটোন খালি বেজে যাচ্ছে। কক্সবাজারের ক্যাম্পে থাকা আত্মীয়স্বজন ফোন করে এখানকার খবরাখবর জানতে চান। ভিডিওকল করে ছবি দেখতে চায়। ভাসানচরের অনেক সুনাম তাদের কাছে করেছি। রান্না করার ভালো জায়গা, সুন্দর ঘর, পৃথক টয়লেট দেখেও তারা খুশি। এখন তারা জানতে চান কীভাবে দ্রুত ভাসানচরে আসা যাবে। অন্য রোহিঙ্গারাও ভাসানচরে চলে আসতে চাচ্ছেন।
হাশেম বলেন, তার স্ত্রী ও সন্তানরাও খুব খুশি। সন্তানরা আশপাশে খেলাধুলা করতে পারছে। তারা স্কুলেও যেতে পারবে। আগে মনে হতো পাহাড়ি কোনো গিঞ্জি এলাকায় থাকি। ভাসানচর একটা শহরের মতো। প্রায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা এখানে আছে।
হাশেমের স্ত্রী হাছিনা বেগম জানান, আগে কক্সবাজারে সাত ছেলেমেয়ে নিয়ে কী কষ্ট করতাম। ঘরের মধ্যে নড়াচড়া করার মতো অবস্থা ছিল না। কক্সবাজারের লেদা ক্যাম্পে তাদের অনেক আত্মীয়স্বজন থাকেন। তারা ভিডিওকল করে ভাসানচরের বাসা ও আশপাশের পরিবেশ দেখে আসতে অস্থির হয়ে গেছে।
ভাসানচরের আশ্রয়ণ-৩-এর প্রকল্প পরিচালক কমডোর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী সমকালকে বলেন, রেশন ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ার পর রোহিঙ্গারা নতুন ঠিকানায় নতুন করে সংসার শুরু করে দিয়েছেন।
ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সার্বিক কল্যাণে কাজ করছে ২২টি এনজিও। ভাসানচরে কাজ করা এনজিওদের সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম এনজিও অ্যালায়েন্সের সমন্বয়ক ও পালস বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সাইফুল ইসলাম চৌধুরী কলিম সমকালকে বলেন, ভাসানচরে প্রথম দফায় স্থানান্তর হওয়া এক হাজার ৬৪২ রোহিঙ্গাকে প্রথম সাত দিন তৈরি করা খাবার সরবরাহের কথা ছিল। তবে রোহিঙ্গারা দ্রুত তাদের খাবারসামগ্রী ও গ্যাস দেওয়ার অনুরোধ করেন। তাদের আগ্রহের কারণেই শনিবার রেশন ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এখন তারা নিজেরা রান্না করে খেতে পারছেন।
সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের ছয় মাসের খাবার মজুদ আছে। প্রতি পরিবারকে এক সঙ্গে এক মাসের খাবার দেওয়া হচ্ছে। এর মাঝে আরও কিছু দরকার হলে তাও সরবরাহ করা হবে। নতুন এলাকা, নতুন পরিবেশে রোহিঙ্গাদের যা কিছু প্রয়োজন তা দিতে প্রস্তুত আমরা। তাৎক্ষণিক তাদের কোনো চাহিদা থাকলে সেটাও দেখা হবে। দাতা সংস্থার সঙ্গে তারা যোগাযোগ করছেন কীভাবে রোহিঙ্গাদের আরও সহায়তা করা যায়।
এপিবিএনের ২৪২ সদস্য ও একটি পূর্ণাঙ্গ থানা: ভাসানচরের নিরাপত্তায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ২৪২ জন সদস্য বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। ভবিষ্যতে ভাসানচরে একটি পূর্ণাঙ্গ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও নৌ পুলিশ স্টেশন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া বর্তমানে ভাসানচরে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ থানা। এরই মধ্যে সরকার ভাসানচর নামে একটি থানার অনুমোদন দিয়েছে।
ভাসানচরে দায়িত্বরত এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শিবলী নোমান সমকালকে বলেন, ভাসানচরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব ভালো। এপিবিএন ও থানা পুলিশ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছে। আগামীতেও যা যা প্রয়োজন সেটা করা হবে।