ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা: উন্নয়ন নয়, কাঠামোগত ব্যর্থতা

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা: উন্নয়ন নয়, কাঠামোগত ব্যর্থতা
×

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে খণ্ডিত প্রকল্প নয়, প্রয়োজন সমন্বিত নীতিগত সংস্কার

রিদুয়ানুল হাকীম রিয়াদ 

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৩৩

চট্টগ্রামে মঙ্গলবার গত চার দশকের তুলনায় সবোর্চ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। বুধবারও চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টি চলছে। পানিতে তলিয়ে গেছে নগরের বেশির ভাগ এলাকা। অথচ চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার, যেখানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পন্ন হয় এবং প্রায় ষাট লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা এখানে। এই শহর শুধু একটি নগর নয়; এটি জাতীয় প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রাম যেভাবে অচল হয়ে পড়ে; কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই সড়ক ডুবে যায়, ব্যবসা থেমে যায়, উৎপাদন ব্যাহত হয়; প্রশ্নটি তাই আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন সরাসরি নীতিনির্ধারণ, শাসনব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন।

প্রমাণভিত্তিক বাস্তবতা: সংকটের গভীরতা কতটা?
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকার প্রায় ৬৫.৫ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল এখনও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ১৩ শতাংশ এলাকা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং আরও ১৭ শতাংশ মাঝারি ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০২৫ সালে এক দিনের ভারী বর্ষণে ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত নগরীর বড় অংশকে অচল করে দেয়। ২০২৬ সালেও একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। পানি নামতে ২ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগা প্রমাণ করে যে বিদ্যমান ড্রেনেজ অবকাঠামো বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয়–সমস্যাটি সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল।

হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: আউটপুট আছে, আউটকাম নেই
জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে একাধিক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। কাগজে-কলমে অগ্রগতি দৃশ্যমান, কিন্তু নাগরিক অভিজ্ঞতা অপরিবর্তিত। নীতিগতভাবে এখানে একটি মৌলিক বিভ্রান্তি কাজ করছে–প্রকল্প সম্পন্ন হওয়াকে সাফল্য হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে, সমস্যার সমাধানকে নয়।
এই ব্যবধান তৈরি হচ্ছে তিনটি কারণে–সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রকল্পভিত্তিক খণ্ডিত পরিকল্পনা, কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহিতার অভাব। সিডিএ, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সমান্তরালভাবে কাজ করছে, কিন্তু একটি সমন্বিত নগর ড্রেনেজ কর্তৃপক্ষ বা একক কমান্ড স্ট্রাকচার নেই। ফলে অবকাঠামো তৈরি হলেও তা সমন্বিতভাবে কাজ করে না।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও প্রাকৃতিক অবকাঠামোর ধ্বংস
গত চার দশকে চট্টগ্রামের প্রায় ৭০ শতাংশ প্রাকৃতিক জলাধার বিলুপ্ত হয়েছে। পুকুর, খাল, জলাভূমি–যেগুলো একসময় বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক মাধ্যম ছিল–সেগুলো ভরাট হয়ে গেছে। নগর উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রে হাইড্রোলজিক্যাল বাস্তবতা বিবেচনা না করেই বাস্তবায়িত হয়েছে। নিচু এলাকায় আবাসন নির্মাণ, প্রাকৃতিক প্রবাহপথ বন্ধ করা এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ডিজাইন–সব মিলিয়ে শহর একটি ‘কৃত্রিম বেসিনে’ পরিণত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন: নীতিতে অনুপস্থিত বাস্তবতা
চট্টগ্রাম একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় শহর। অতিবৃষ্টি, জোয়ারের পানি বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে জলাবদ্ধতার তীব্রতা বাড়ছে। তবুও নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় ক্লাইমেট-রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার, নেচারবেইজড সল্যুশন এবং ক্লাইমেট বাজেটিং এখনও প্রান্তিক অবস্থানে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ঝুঁকি কমানোর চেয়ে দৃশ্যমান অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: নীতিগত ব্যর্থতা ও আচরণগত সংকট
প্রতিদিন উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ড্রেন ও খালে গিয়ে জমা হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যমান ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এখানে দ্বিমাত্রিক ব্যর্থতা রয়েছে–কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতির বাস্তবায়ন ঘাটতি নাগরিক আচরণ পরিবর্তনে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের অভাব।
কাঠামোগত সংকট: ব্যক্তি নয়, সিস্টেম
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; এটি একটি সিস্টেমিক গভর্ন্যান্স ফেইলিউর। দায়িত্বের বিভাজন আছে, কিন্তু কর্তৃত্বের একীকরণ নেই; পরিকল্পনা আছে, বাস্তবায়নে সমন্বয় নেই; বাজেট আছে, ফলাফলের ওপর নজরদারি নেই। ফলে সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে, কিন্তু দায় নির্ধারণ হয় না।

নাগরিক আন্দোলন: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
জলাবদ্ধতা ইস্যুতে নাগরিক সমাজ, তরুণ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সক্রিয়। তবে এই আন্দোলনগুলোর মধ্যেও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। প্রকল্পনির্ভরতা, স্বল্পমেয়াদি ফান্ডিং এবং নির্দিষ্ট আউটপুটের চাপ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করছে। অন্যদিকে, ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো, প্রশাসনিক চাপ এবং মধ্যম পর্যায়ের কর্মীদের হয়রানি আন্দোলনের গতি কমিয়ে দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু নেতৃত্ব নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে বা আপস করে। ফলে যে আন্দোলন কাঠামো পরিবর্তনের কথা বলে, সেটি অনেক সময় নিজেই সেই কাঠামোর অংশ হয়ে পড়ে।

নীতিগত সংস্কারের রূপরেখা: এখনই সিদ্ধান্তের সময়
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে খণ্ডিত প্রকল্প নয়, প্রয়োজন সমন্বিত নীতিগত সংস্কার–সব সংস্থাকে সমন্বিত করে একটি একক কর্তৃপক্ষ গঠন, যার অধীনে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও মনিটরিং হবে; ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদ করে জলবায়ু ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করা; খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ এবং আরবান ওয়াটার রিটেনশন স্পেস তৈরি; প্রকল্পভিত্তিক নয়, আউটকামভিত্তিক মূল্যায়ন এবং জনসমক্ষে অগ্রগতি প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা; বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান এবং কঠোর আইন প্রয়োগ; নগর অবকাঠামোতে জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে আলাদা বাজেট ও নীতি প্রণয়ন।
উন্নয়ন নাকি অভিযোজন?
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা এখন আর কেবল একটি নগর সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা এবং উন্নয়ন দর্শনের একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। যদি একই শহর প্রতি বছর ডুবে যায়, একই প্রকল্প বারবার চলে, এবং একইভাবে জবাবদিহিতা অনুপস্থিত থাকে, তাহলে এটি ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি, উন্নয়নের নয়। এখন প্রশ্নটি নীতিনির্ধারকদের সামনে–আমরা কি প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের ভেতরেই ঘুরপাক খাব, নাকি কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি কার্যকর, সহনশীল এবং জবাবদিহিমূলক নগর গড়ে তুলব? চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ সেই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

রিদুয়ানুল হাকীম রিয়াদ: ইয়াং ডেভেলপমেন্ট এক্টিভিস্ট, চট্টগ্রাম 
 

আরও পড়ুন

×