নিরাপদ খাদ্য
কৃষির নতুন লক্ষ্য হোক বিষমুক্ত খাদ্য
মো. আবু তালেব
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। সেই অধিকার ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। বাজারে ফল, সবজি, মাছ, দুধ, ডিম কিংবা চাল; প্রায় প্রতিটি খাদ্যপণ্য নিয়ে ভোক্তাদের মনে প্রশ্ন: এটি কি সত্যিই নিরাপদ? উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক, হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক এবং সংরক্ষণকারী রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা আজ একটি জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। তাই এখন আর শুধু উৎপাদন বাড়ানোর কথা বললে চলবে না। সময়ের দাবি হলো এমন একটি কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা একই সঙ্গে উৎপাদনশীল, লাভজনক এবং বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে সক্ষম।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বছরে ৪ কোটি টনের বেশি ধান উৎপাদিত হয় এবং সবজি উৎপাদনেও বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর অন্যতম। এই অর্জন নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু উৎপাদনের এই সাফল্যের আড়ালে একটি কঠিন বাস্তবতা হলো, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারিনি।
দেশে কীটনাশকের ব্যবহার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর হাজার হাজার টন কীটনাশক কৃষিজমিতে ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক সঠিক মাত্রা, সময় কিংবা ব্যবহারের নিয়ম না মেনে কীটনাশক প্রয়োগ করেন। যে কারণে ফসলে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থেকে যায়, যা সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
অধিকাংশ কৃষক দ্রুত ফলন, বাজারে প্রতিযোগিতা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে তারা যথাযথ প্রশিক্ষণ পান না। কৃষি উপকরণ বিক্রেতাদের ভুল পরামর্শ, দুর্বল সম্প্রসারণ সেবা এবং মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত তদারকের অভাবও সমস্যাকে জটিল করেছে। অন্যদিকে ভোক্তারও একটি ভূমিকা রয়েছে। আমরা প্রায়ই আকারে বড়, রঙে উজ্জ্বল ও দেখতে আকর্ষণীয় ফল, সবজিকে গুরুত্ব দিই। ফলে কৃষকও বাজারের চাহিদা পূরণে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করতে উৎসাহিত হন। অথচ নিরাপদ খাদ্য অনেক সময় বাহ্যিকভাবে কম আকর্ষণীয় হলেও স্বাস্থ্যকর।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও তীব্র করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নতুন নতুন পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে কৃষক আরও বেশি কীটনাশক ব্যবহার করছেন। তাই নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি এখন শুধু কৃষির নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের প্রশ্ন। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রথমেই কৃষিব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। উৎপাদনের একমাত্র লক্ষ্য যদি হয় পরিমাণ বৃদ্ধি, তাহলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন হবে। কৃষিনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে নিরাপদ, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা।
জৈব কৃষি, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, ফেরোমন ফাঁদ, জৈব বালাইনাশক, কম্পোস্ট সার এবং বায়োপেস্টিসাইডের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে অনেক কৃষক এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হয়েছেন। সরকার, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত এসব সফল মডেল দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। কৃষি গবেষণায় আরও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এমন জাত উদ্ভাবন করতে হবে, যেগুলো রোগবালাই প্রতিরোধী এবং কম রাসায়নিক ব্যবহারেই ভালো ফলন দেয়। একই সঙ্গে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা সঠিক মাত্রায় সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেন এবং ফসল সংগ্রহের আগে নির্ধারিত অপেক্ষাকাল মেনে চলেন।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগও অপরিহার্য। অননুমোদিত কীটনাশক, ভেজাল সার ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের অবাধ বিক্রি বন্ধ করতে হবে। বাজারে নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা, দ্রুত ল্যাব সুবিধা বৃদ্ধি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি কৃষিপণ্যের উৎপাদন, ব্যবহৃত উপকরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ডিজিটালভাবে অনুসরণ করা গেলে ভোক্তার আস্থা বাড়বে এবং দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিরাপদ খাদ্যকে বিলাসিতা নয়, নাগরিক অধিকার হিসেবে দেখতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল মানুষের জন্য আলাদা নিরাপদ খাদ্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য– এমন বৈষম্য কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং কৃষকের নৈতিক দায়বদ্ধতা।
ড. মো. আবু তালেব: অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, স্কুল অব এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট, বাংলাদেশ
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- নিরাপদ খাদ্য