ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

জলাবদ্ধতা

৪৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি, বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

এক দিনে ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টি

৪৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি, বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম
×

চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহরে রেললাইনের ওপর পানি জমে থাকায় প্রায় ৬৫০ জন যাত্রী নিয়ে আটকা পড়েছে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তোলা -মো. রাশেদ

 চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্মরণকালের সর্বোচ্চ বৃষ্টি দেখল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। আবহাওয়া অফিস তথ্য দিচ্ছে, ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি ঝরেছে ৩৯৪ মিলিমিটার! যা ১৯৮৩ সালের পর, অর্থাৎ ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। শঙ্কা থাকলেও এই তুমুল বৃষ্টিতে নগরের কোথাও পাহাড় ধসের খবর পাওয়া যায়নি। তবে টানা বৃষ্টিতে বেশ ভুগছে মানুষ। ছন্দপতন ঘটেছে নগরজীবনে।

গত সোমবার শুরু হওয়া বৃষ্টি গতকাল মঙ্গলবারও থামেনি। ফলে হাঁটু থেকে কোমরপানিতে ডুবে যায় নিচু এলাকা। বিপাকে পড়েন কর্মজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষ। বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলার আজ বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

টানা বৃষ্টিতে রেলপথে পানি ওঠায় দুপুরে ছয় শতাধিক যাত্রী নিয়ে নগরীর ষোলশহর স্টেশনে আটকা পড়ে কক্সবাজারগামী ট্রেন পর্যটক এক্সপ্রেস। দীর্ঘ ১১ ঘণ্টার ভোগান্তি শেষে গতকাল রাত ১১টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করে রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে রাত কাটানোর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ট্রেনের প্রায় ছয় শতাধিক যাত্রী। এদিকে, সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামায়ও ছেদ পড়ে। পতেঙ্গায় ভেঙে যায় নবনির্মিত সড়ক।

জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন টিমের সঙ্গে কাজ করছে সেনাবাহিনীর ২০টি দল। পাহাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বাস করা জনগণকে সরিয়ে নিতে চলছে মাইকিং। খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র। ভারী বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ভূমিধসের শঙ্কা জানিয়ে আবহাওয়া অফিস থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। টানা বর্ষণে গতকাল নগরীর বাদুরতলা,  চকবাজার, কাতালগঞ্জ, চান্দগাঁও, বাকলিয়া, মোহরা, আগ্রাবাদ, পাঠানটুলীসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুপানি জমে যায়। হাটহাজারী সড়কে জমে কোমরপানি।

সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন নগরীর নিম্নাঞ্চল পরিদর্শন করে বলেছেন, প্লাস্টিকজাতীয় পণ্য আটকে থাকায় খাল-নালা দিয়ে স্বাভাবিক পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি যোগ হয়ে অনেক এলাকায় জলজট তৈরি হয়েছে। তবে কোথাও পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকেনি। আগে যেসব এলাকা কোমরপানিতে ডুবত, সেসব স্থানে এবারে পানি ওঠেনি সেভাবে। তিনি জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ আগামী বছর পুরোপুরি শেষ হবে। প্রকল্পের সুফলও তখন শতভাগ পাবেন জনগণ। 
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, চউকের প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল আছে। পানি যাতে জমে না যায়, সে জন্য পাম্পের মাধ্যমে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পানিতে থইথই নগরী
গতকাল সকালে নগরীর বাদুরতলা আরকান সোসাইটি আবাসিক এলাকায় দেখা গেছে হাঁটুসমান পানি। অনেক বাসাবাড়ির পাশাপাশি সোসাইটির মসজিদটিতেও পানি ঢুকে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা আকবর নেওয়াজ  বলেন, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে অনেক ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে।

নগরীর কাতালগঞ্জ এলাকায় বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। গতকাল সকালেও এই এলাকার কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে যায়। সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন সিটি মেয়র। কাতালগঞ্জ এলাকায়ও যান তিনি। এ সময় তিনি বলেন, কাতালগঞ্জ এলাকা নিচু হওয়ায় ভারী বৃষ্টি হলে পানি জমে যায়। তবে বৃষ্টি কমলে পানিও নেমে যায়। যেসব এলাকায় পানি জমেছে, সেসব এলাকায় খালের কাজ চলছে। বিদ্যমান জলাবদ্ধতা সমস্যাটি পুরোপুরি নিরসনে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি জেলার আজ বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল রাতে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামানের সই করা এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্থগিত হওয়া এলাকার পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা পরে আলাদা প্রশ্নপত্রে নেওয়া হবে।
পরীক্ষা স্থগিতের আদেশে বলা হয়, অন্যান্য শিক্ষা বোর্ড এবং চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতাধীন কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার পরীক্ষা যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে গতকাল নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। সিটি করপোরেশনের অধীনে ৪৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা ছিল। সেই পরীক্ষা স্থগিত করা হয় বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা কিসিঞ্জার চাকমা।

বৃষ্টি থাকবে আরও কয়েক দিন
আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রামের উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ু অতিমাত্রায় সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া নিম্নচাপের কারণে বৃষ্টি হচ্ছে। এক সপ্তাহ পর্যন্ত কমবেশি বৃষ্টি হতে পারে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়া কর্মকর্তা সুমন সাহা জানিয়েছেন, গতকাল মঙ্গলবার ৩৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এবারের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৩ সালে। সেবার ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল ৪০৭ মিলিমিটার। 

পর্যটক এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল
ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের রেলপথেও পানি ওঠে। এতে গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজারগামী ট্রেন পর্যটক এক্সপ্রেস আটকা পড়ে নগরীর ষোলশহর এলাকায়। দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা পর রাত ১১টার দিকে ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করা হয়। এতে যাত্রীরা সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়েন। রেল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে যাত্রীদের টিকিটের পুরো টাকা ফেরত দেওয়া হবে। যাত্রা বাতিলের পর অনেক যাত্রী বাসে করে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন। কেউ কেউ চট্টগ্রামের হোটেলে রাতযাপনের সিদ্ধান্ত নেন। কিছু যাত্রী ষোলশহর রেলস্টেশনেই থেকে যান। 
চট্টগ্রাম রেলওয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেললাইনের ওপর এখনও প্রায় ২০ ইঞ্চি পানি জমে আছে। পানি অন্তত ছয় ইঞ্চিতে না নামলে ট্রেনের ইঞ্জিন চালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সন্ধ্যার দিকে পানি কিছুটা কমলেও রাতে বৃষ্টি বেড়ে যাওয়ায় পানি আবার বাড়তে শুরু করে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে যাত্রীদের সুরক্ষায় রাত ১১টার দিকে ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করা হয়েছে।
ষোলশহর স্টেশনের মাস্টার আরিফুল ইসলাম বলেন, ৬৫০ জনের বেশি যাত্রী নিয়ে সকালে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি দুপুর ২টা ৪০ মিনিটের দিকে কক্সবাজারে পৌঁছানোর কথা ছিল।

জাহাজ থেকে পণ্য খালাস সাময়িক বন্ধ
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে (আউটার অ্যাঙ্করেজ) থাকা বড় ৪৩টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। তবে জেটিতে কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। জেটি থেকে পণ্য নিয়ে আসা-যাওয়া করছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লরি। স্বাভাবিক আছে কাস্টমসের শুল্কায়ন প্রক্রিয়াও।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামিম বলেন, সাগর উত্তাল থাকায় বহির্নোঙরে পণ্য খালাস কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে খালাস কার্যক্রম আবার শুরু করা হবে। তিনি জানান, বন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত জারি রয়েছে। এ জন্য ৪৩টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কাজ স্থগিত আছে। 

বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত
ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামায় ছেদ পড়ে। ফ্লাইট স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা দুটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাঠানো হয়। এ ছাড়া ঢাকা থেকে আসা অভ্যন্তরীণ একটি ফ্লাইটও অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় ফিরে যায়। বিমানবন্দর এলাকায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে বাতাস বইছিল।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. ইব্রাহিম খলিল জানান, সকালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট আবুধাবি থেকে চট্টগ্রামে নামার কথা থাকলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেটি ঢাকায় অবতরণ করে। একইভাবে এয়ার অ্যারাবিয়ার একটি ফ্লাইট শারজাহ থেকে চট্টগ্রামে নামার কথা থাকলেও সেটিও ঢাকায় অবতরণ করে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট চট্টগ্রামে নামতে না পেরে ঢাকা ফিরে যায়। 

দেয়াল ধসে যুবকের মৃত্যু
নগরীর পূর্ব নাসিরাবাদ রহমান নগর আবাসিক এলাকার বি-ব্লকে গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দেয়াল ধসে মাছ ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের (৩০) মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় তাঁর দুই শিশুসন্তান ও শাশুড়ি আহত হয়েছেন। শফিকুলের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে। 

প্রধান প্রকল্পের কাজ ফেব্রুয়ারিতে শেষ করার ঘোষণা 
চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমে নগরের জলাবদ্ধতা ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কমেছে বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ও সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহসিন। আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রকল্পের সব কাজ শেষ হলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার অবসান হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
গতকাল নগরের বাকলিয়ার রাজাখালী আর্মি ক্যাম্পে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, নগরে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অধীনে থাকা ৩৬টি খালের মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ছয়টির মধ্যে পাঁচটির কাজ ৯৮ শতাংশ শেষ। তবে হিজড়া খালের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৬৮ শতাংশ। এটি শেষ হলেই মিলবে শতভাগ সুফল। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর খালগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

 

আরও পড়ুন

×