ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

অবিশ্বাস্য ফেরা, রুদ্ধশ্বাস জয় 

অবিশ্বাস্য ফেরা, রুদ্ধশ্বাস জয় 
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৯

স্নায়ুর ওপর তোলপাড় না করে কবেই বা শেষ হাসি হেসেছে নীল-সাদা ব্রিগেড? ম্যারাডোনার মেক্সিকো ৮৬ থেকে মেসির কাতার ২২– আর্জেন্টাইন ফুটবলের ডিএনএতেই তো লেখা আছে এই হার্ট-অ্যাটাক ফুটবল! আটলান্টার মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামেও তার ব্যতিক্রম হলো না। প্রথমার্ধে ফারাওদের সেই বিষাক্ত ছোবল, তারপর পেনাল্টি নষ্ট করে খাদের কিনারায় চলে যাওয়া– সব মিলিয়ে বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের তখন হার্ট-অ্যাটাক হওয়ার জোগাড়। কিন্তু ওই যে, ফুটবল ঈশ্বরের স্ক্রিপ্টে ট্র্যাজেডি থাকলেও শেষ দৃশ্যে থাকে এক রাজকীয় রূপকথা। মেসির রূপকথা। শেষ পর্যন্ত ৭৯ মিনিটে রোমেরোর গোলে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসা, ৮৩ মিনিটে মেসির সমতা আর অতিরিক্ত সময়ের ৯২ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোল। ৩-২ গোলে মিসরকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা এখন কোয়ার্টার ফাইনালে। কলম্বিয়া ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের জয়ী দলের সঙ্গে ১১ জুলাই কানসাসে ফের মুখোমুখি হবেন মেসিরা।

এদিন আর্জেন্টিনা যেন  নতুন  শেখাল– খাদের কিনারা থেকে কীভাবে অবর্ণনীয় প্রত্যয়, অবিশ্বাস্য কৌশল আর বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের এক মৃতপ্রায় ম্যাচ বাঁচিয়ে আনা যায়। ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত  ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর ফুটবলবিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে তারা ম্যাচটিতে যে মহাকাব্যিক জয় ছিনিয়ে এনেছে, তা কেবল একটি ম্যাচ জয় নয়; বরং এটি ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ও রোমাঞ্চকর ‘কামব্যাক’ বা ফিরে আসার গল্প হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মেসিও কাঁদলেন, তবে সেটা ছিল সত্যিকারের আনন্দাশ্রু। এ কান্না পেনাল্টি মিসের খেসারত দিতে দিতে খাদের কিনারায় চলে যাওয়ার যন্ত্রণার, এ কান্না তীব্র এক মুক্তির। তাঁর চোখের জল শুকানোর আগেই অধিনায়ককে কাঁধে তুলে নিলেন রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজরা। মাঠের মাঝখানেই শুরু হয়ে গেল সেই চেনা আদিম উল্লাস, সতীর্থদের কাঁধে চড়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রাজার সেই চিরন্তন নাচ। মারাকানার ভূত তাড়িয়ে, স্নায়ুর যুদ্ধ জিতে মেসিরা যখন মাঠ ছাড়ছেন, তখন ফুটবলবিশ্ব আরও একবার স্বীকার করতে বাধ্য হলো আর্জেন্টিনা মানেই শুধু ফুটবল নয়, আর্জেন্টিনা মানে একটা আস্ত রোলার কোস্টার রাইড!

মার্সিডিজ বেঞ্জে তখন যেন দুটো ভিন্ন ঘরানার অসম লড়াই চলছিল– একদিকে আভিজাত্যের নীল-সাদা ট্যাঙ্গো, আর অন্যদিকে ফারাওদের সেই আদিম, পেশিবহুল আফ্রিকান পাওয়ার ফুটবল। সত্যি বলতে, প্রথমার্ধে মিসরের ওই অমানুষিক শারীরিক শক্তির কাছে রীতিমতো হাঁসফাঁস করছিল স্কালোনির ছেলেরা। মাঝমাঠে বলের দখল নিতে গেলেই যেন পাথুরে দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছিলেন এনজো-ডি পলরা, কাঁধের লড়াইয়ে ছিটকে যাচ্ছিলেন প্রতি পদে। বক্সে উড়ে আসা বলটিতে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার পারদেস পজিশন নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। সেই সুযোগে মিসরের ডিফেন্ডার ইয়াসের ইব্রাহিম চমৎকার টাইমিংয়ে বাতাসে লাফিয়ে উঠে এক দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন। এরপর পেনাল্টির সুযোগ এসেছিল মেসির পায়ে। গোললাইনের নিচে তখন দাঁড়িয়ে এক ভিন্ন গ্রহের মিসরের প্রাচীর। নাম তাঁর মোস্তফা শৌবির। বামদিকে ডাইভ দিয়ে মেসির শটটা যখন তিনি রুখে দিলেন, মনে হলো মারাকানার সেই চেনা ভূতটা আবার ভর করেছে আলবিসেলেস্তেদের ওপর। পেনাল্টি মিসের লজ্জার একটি রেকর্ড এমনিতেই তাঁকে তাড়া করেছিল, এদিন যেন সেই দায় আরও বাড়িয়ে তুলেছিলেন। বিশ্বকাপে টাইব্রেক ছাড়া নেওয়া মেসির আটটি পেনাল্টির চারটিই মিস! এরপর ম্যাচের ৬৯তম মিনিটে আলবিসেলেস্তেদের স্তব্ধ করে ব্যবধান ২-০ করে মিসর। এর ঠিক ১০ মিনিট আগে মিসরের আরেকটি গোল ভিএআর প্রযুক্তির কারণে বাতিল হলেও দ্বিতীয় গোলটির সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্সকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেয় ফারাওরা। মিসরের হাইসেম হাসান ডান প্রান্ত দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এরপর তিনি বক্সের ভেতর চমৎকার একটি ব্যাক-পাস (কাট-ব্যাক) বাড়ান। সেখানে ছুটে এসে মিসরের ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো অত্যন্ত ক্লিনিক্যাল এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল আর্জেন্টিনার জালে পাঠিয়ে উল্লাসে মাতেন।

দ্বিতীয়ার্ধে কৌশলে কিছুটা পরিবর্তন আনেন আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি। মাঝমাঠ থেকে ডি পলকে উঠিয়ে নামান শক্তিশালী লাউতারো মার্টিনেজকে আর ডিফেন্সে মলিনাকে সরিয়ে ওটামেন্ডিকে। মিসরের ডিবক্সের সামনে প্রায় ছয় ডিফেন্ডারের জাল ছিল, তার মধ্যেও মেসিকে ভর করেই চলতে থাকে আর্জেন্টিনার মুক্তির লড়াই। ৭৯ থেকে ৮৩ মিনিট– দু-দুটি গোলে টর্নেডো তুলে দেন মেসিরা। পিরামিডের দেয়াল ভেঙে বল জালে জড়ালেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো! ব্যবধান ২-১ হতেই ফারাওদের সাম্রাজ্যে কম্পন শুরু হলো। এর ঠিক ৪ মিনিট পর, ৮৩ মিনিটে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ– বক্সের ভেতর বল পেতেই চিতার ক্ষিপ্রতায় শরীরটা মোচড় দিয়ে বাঁ পায়ের সেই চিরন্তন ভলিতে স্কোরলাইন ২-২ করে দিলেন স্বয়ং এলএম টেন! ক্লাইমেক্সের যে তখনও শেষ দৃশ্য বাকি। ৯২ মিনিটে লাউতারোর উড়ে আসা বলটিতে বাতাসে ডাইভ দিয়ে যে মরণকামড় হেডটি করলেন এনজো ফার্নান্দেজ, তা সোজা আছড়ে পড়ল মিসরের জালে! ৩-২! মাত্র তেইশ মিনিটের এক অতিমানবীয় ঝড়ে ফারাওদের পেশিবহুল দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। সেখানে রূপকথার মতো প্রত্যাবর্তনের অধ্যায় যোগ করে আর্জেন্টিনা।

আরও পড়ুন

×