নক্ষত্রেরও একদিন বিদায় নিতে হয়
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১০:১৯
থিয়েটারের শেষ অঙ্কে পর্দা পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে মঞ্চের আলোগুলো যেভাবে একে একে নিভে আসে, আমেরিকার এই ফুটবল মহোৎসবেও এখন ঠিক তেমনই এক অদ্ভুত, মায়াবী অন্ধকার নেমে আসছে। গ্যালারিভর্তি লাখো দর্শক এখনও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছেন ঠিকই; কিন্তু মাঠের সবুজগালিচায় তাকালে এক অপার্থিব, অদৃশ্য শূন্যতা অনুভব করা যায়।
যে বিশাল ক্যানভাসটা এতদিন নেইমার দ্য সিলভা আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোদের মতো মহাতারকাদের পায়ের জাদুতে, তুলির টানে রূপকথার মতো রঙিন দেখাত– মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার ব্যবধানে সেটাই যেন এক ভাঙা চাঁদের হাট! সময়ের বড় নিষ্ঠুর হিসাব। ফুটবল ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক যুগের অবসান ঘটিয়ে একে একে নিভে যাচ্ছে বিশ্বকাপের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা। যে সোনালি অধ্যায়ের শুরুটা হয়েছিল এক মহাসমুদ্রের উত্তাল গর্জন আর রাজকীয় অহংকার দিয়ে, নিয়তির পরিহাসে আজ তা এসে থমকে দাঁড়িয়েছে কেবল একবিন্দু নোনতা চোখের জলে।
ফুটবল আকাশের ট্র্যাজেডিটা শুধু নেইমার বা রোনালদোতেই শেষ হয়ে যায়নি; এই বিশ্বকাপ আসলে একটা গোটা প্রজন্মের শেষ যাত্রার দলিল। ৪০ বছরের তরুণ লুকা মডরিচ? ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলকে যিনি বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়তে শিখিয়েছিলেন, মাঝমাঠের সেই বিষণ্ন রাজপুত্রেরও তো ম্যাজিক শেষ হলো এই আসরেই। জার্মানির প্রাচীর ম্যানুয়েল নয়্যার যখন টাইব্রেকারের পেনাল্টি মিসের পর গোলপোস্টে মাথা কুটে কাঁদছেন কিংবা মেক্সিকোর চীনের প্রাচীর গুইলার্মো ওচোয়া যখন শেষ ম্যাচ হেরে আজতেকা স্টেডিয়ামের বারপোস্টে শেষ বিদায়ী চুম্বন এঁকে দিচ্ছেন, তখন স্মৃতির আড়ালে চলে যায় গোটা একটি প্রজন্ম।
তারা প্রত্যেকেই জানতেন, এটাই তাদের শেষ বিশ্বকাপ, জীবনের শেষ মহাকাব্য। এ-ও জানা ছিল যে, গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হয়ে নকআউটের ধারালো মঞ্চে পা রাখা মানেই প্রতিটি মুহূর্ত যেন একেকটা টাইমবোমা, যে কোনো এক রাতে বেজে উঠতে পারে বিদায়ের করুণ সুর। সব জেনেশুনেই তো নেমেছিলেন। তাও পারলেন না। বুক বেঁধে নেমেও শেষ পর্যন্ত যখন রেফারি শেষ বাঁশিটা বাজিয়ে দিলেন, তখন আর কোনো বাঁধ মানল না। সমস্ত ইস্পাতকঠিন অহংকার, এত বছরের লড়াই, সব ধুয়ে-মুছে একাকার হয়ে গেল। গ্যালারির দিকে যখন শেষবারের মতো তাকালেন, যেখানে লাখো ভক্তের চিৎকার ম্লান হয়ে আসছিল, তখন আর ওই চোখের কোণের জলটাকে আটকে রাখা গেল না। শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে হলো নেইমারকে। আর রোনালদো চোখ মুছলেন না ট্রফি না পাওয়ার বিশাল শূন্যতা নিয়ে। তাদের এই কান্না আসলে শুধু ম্যাচ হারের ছিল না; ওটা ছিল একটা আস্ত জাদুকরি যুগের শেষ সূর্যাস্তের হাহাকার।
একটা দেশ, যার ফুটবলের ইতিহাস বলতে একসময় মানুষ শুধু ইউসেবিও নামের এক কৃষ্ণবর্ণ চিতাবাঘের গল্প জানত কিংবা লুইস ফিগোর সেই সোনালি প্রজন্মের আংশিক সাফল্য– সেই পর্তুগালকে বিশ্ব ফুটবলের মূল মঞ্চে নতুন করে, রাজকীয়ভাবে চিনিয়েছিলেন তো এই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোই। তিনি আসার আগে পর্তুগাল ছিল ইউরোপের এক মধ্যমেধার দল, যারা বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতেই খাবি খেত। আর সিআরসেভেন আসার পর? লিসবনের অলিগলি থেকে শুরু করে পোর্তোর সমুদ্রসৈকত– গোটা দেশটা হঠাৎ করেই বিশ্ব ফুটবলের বিশ্বস্ত এক পরাশক্তি হয়ে উঠল। তিনি শুধু একা ১৪৬টি আন্তর্জাতিক গোল করেননি; তিনি একটা গোটা জাতির মানসিকতা বদলে দিয়েছিলেন। যখন তিনি বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিচ্ছেন, তখন পর্তুগাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আলমারিতে ট্রফি আছে, বিশ্বজোড়া সমীহ আছে। বিদায় বেলায় সে কথাটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন রোনালদো।