ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

শেষ হলো তাঁর তপস্যার বিশ্বকাপ

শেষ হলো তাঁর তপস্যার বিশ্বকাপ
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১০:১২

ম্যাচ শেষে টানেলের দুপাশে তখন ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা চেনা মুখগুলোর সারি। কেউ হয়তো হাত নাড়ালেন শেষবারের মতো, কেউবা আরেকটু সাড়া পাওয়ার আশায় শেষ আকুতিতে চিৎকার করে উঠলেন ‘শিউউ...’ বলে! খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকা মানুষটি বোধ হয় সেদিকে খেয়াল করেননি। তিনি হাঁটতে থাকলেন এক অনন্ত বিশ্রামের দিকে, যেখানে কোনো ট্রফির চাপ নেই, নেই কোনো রেকর্ডের তাড়া; আছে কেবলই এক আদিম শান্তি। দুই দশক ধরে ফুটবলের তপোবনে যিনি নিজের রক্ত, ঘাম আর অবিচল নিষ্ঠায় ফুটবলকে এক পবিত্র সাধনায় রূপ দিয়েছিলেন, সেই নিঃসঙ্গ মহর্ষি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিছুক্ষণ আগেই স্পেনের কাছে হেরে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিশ্বমঞ্চকে বিদায় জানিয়ে এসেছেন। তাঁকে আর পিছু ডেকে বিরক্ত করলেন না কেউ। এক ভাঙা মানুষের কান্নাভেজা, বিষণ্ন মুখকে যেতে দিলেন তাঁর আপন মনেই। শেষ হয়েছে তাঁর তপস্যার বিশ্বকাপ।

ফুটবল-বিধাতা বড্ড নিষ্ঠুর; বিদায়বেলায় এই মহাতারকাকে একটা সোনার বিশ্বকাপ দিলেন না ঠিকই, কিন্তু ট্রফিহীন এই বিষাদময় প্রস্থানেই রোনালদোকে বানিয়ে দিয়ে গেলেন কোটি ভক্তের হৃদয়ের চিরকালীন ‘মুকুটহীন সম্রাট’। যিনি কিনা নিজের শরীরকে স্রেফ একটা ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফুটবল নামক পবিত্র খেলাটার আরাধনা করে গেছেন। তাঁর এই মাঠের পরম তপস্বীর সাধনা কী করে ভুলবে এই প্রজন্ম। একচল্লিশের বয়সের ভারে, নয়তো এক অলৌকিক শিকড়ের টানে– নাবিককে ফিরতেই হয় ডাঙার নীরবতায়। নক্ষত্ররা যেমন আকাশের বুক থেকে নিঃশব্দে বিদায় নেয়, সবুজ ঘাসের মায়া কাটিয়ে তেমনিই বোধ হয় নোঙর ফেললেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কোনো অপূর্ণতা? বিশ্বকাপ না পেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকার না পাওয়ার আফসোস? 

মিক্সড জোনে রোনালদোকে কাছে পেয়ে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছিলেন অনেক কিছুই। কিন্তু রোনালদো ছিলেন রোনালদোর মতোই। ‘২০১৬ সালের ইউরো জয়ই এই পর্তুগাল দলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য, যা আমার কাছে একটি বিশ্বকাপ জেতার মতোই সমান মর্যাদার। আমি পর্তুগালের হয়ে তিনটি ট্রফি জিতেছি (২০১৬ ইউরো, ২০১৯ ও ২০২৫ নেশনস লিগ)। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর আগে পর্তুগাল কোনোদিন একটি আন্তর্জাতিক শিরোপাও জেতেনি।’ স্মৃতিগুলো যেন তাঁর হৃদয়েরই ছবি এঁকে দিল। একটু আগেই তিনি স্পেনের কাছে হেরে পর্তুগালের বিদায়ের পর সত্যটা মেনে নিয়েছিলেন চোখ মুছে। মাঠ ছেড়েছিলেন একবুক হাহাকার আর সোনালি স্বপ্নভঙ্গের অশ্রু নিয়ে। তবে বিশ্বকাপকে বিদায় বললেও এখনই আন্তর্জাতিক ফুটবল ছেড়ে দিচ্ছেন না। পর্তুগাল জাতীয় দল বা সামগ্রিক ফুটবল থেকে এখনই অবসর নেবেন কিনা– জানতে চেয়েছিলেন তাঁর স্বদেশি সাংবাদিকরা। ‘বাকি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ভাবার জন্য আমি যথেষ্ট সময় পাব। এখন আমি পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাব। মুহূর্তের উত্তেজনায় আমি কোনো হুট করে সিদ্ধান্ত নিতে চাই না।’ দুটি ইচ্ছার কথা তিনি আপনজনের কাছে বিশ্বকাপের আগেই বলে রেখেছেন। এক. ক্যারিয়ারে হাজারতম গোল করতে চান, যার সংখ্যা এখন ৯৭৬। দুই. ষোলো বছর বয়সী তাঁর ছেলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জুনিয়রের সঙ্গে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক টুর্নামেন্টে এক দলের হয়ে খেলতে চান। এ দুটি সংকল্পের জন্য তিনি নিশ্চিত আরও তপস্যা করবেন।

আসলে তিনি বিশ্ব ফুটবলের এমন এক নক্ষত্র, যাঁকে অঙ্ক বা সংখ্যায় কখনও মাপা যায়নি। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে ১৩৫টির বেশি গোল করে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটা তো তিনি নিজের নামেই রেজিস্ট্রি করিয়ে নিয়েছেন। পাঁচ-পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, চ্যাম্পিয়ন্স লিগের পাঁচটি রাজকীয় ট্রফি আর ক্লাব ও দেশ মিলিয়ে হাজারের কাছাকাছি অফিসিয়াল গোলের যে দানবীয় এভারেস্ট তিনি গড়েছেন, তা ভাঙার মতো উত্তরসূরি এই মুহূর্তে বোধ হয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। একজন এসেছিলেন এদিন ম্যাচ শেষে তাঁর বুকে আশ্রয় নিতে– লামিনে ইয়ামাল; স্পেনের জয়ের উদযাপনের মাঝেই, রোনালদোর সেই কান্নাভেজা বুকভাঙা হাহাকার দেখে ছুটে এলেন। যে ছেলেটির জন্মের আগে থেকে রোনালদো বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করছেন, সেই ভবিষ্যৎ নক্ষত্রটি আজ নতজানু হয়ে পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরলেন এই ফুটবল-তপস্বীকে। একবুক বিষণ্নতার মধ্যে ইয়ামালের সেই পরম আলিঙ্গন যেন ছিল ফুটবল ইতিহাসের রাজকীয় ব্যাটন বদল। এক যুগের মহাপ্রস্থানের সঙ্গে অন্য যুগের রাজকীয় আবাহন।

যেখানে ইয়ামালের শুরু, সেখানেই রোনালদোর সারা। তাঁর প্রথম বিশ্বকাপেই শেষ হলো রোনালদোর ছয়টি বিশ্বকাপের উপাসনা। ছয়-ছয়টি বিশ্বকাপ! ভাবা যায়? ২০০৬ সালের জার্মানিতে সেই ছটফটে তরুণ উইঙ্গার থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের আমেরিকার এই ৪১ বছরের পরিপক্ব ক্লান্তিহীন নাবিক– দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় থিয়েটারটাকে স্রেফ একার ইশারায় নাচিয়ে গেলেন সিআরসেভেন! ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র পুরুষ ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অলৌকিক এভারেস্ট তিনি জয় করেছেন। রেকর্ডবুকে তো অনেকেই নাম লেখায়, কিন্তু রোনালদো রেকর্ডবুকটাকে স্রেফ নিজের ঘরের ডায়েরি বানিয়ে নিয়েছিলেন! ২০০৬ সালে ইরানের বিপক্ষে পেনাল্টি দিয়ে যে গোলযাত্রার শুরু, তা শেষ হলো ২০২৬-এ এসে। ২৬টি বিশ্বকাপ ম্যাচের মরণপণ লড়াই আর ১১টি রাজকীয় গোলের ওই একেকটা পদচিহ্ন কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়; ওগুলো হলো সবুজগালিচায় এক নিঃসঙ্গ সম্রাটের অবিসংবাদিত বীরত্বের জলছবি। সোনার ট্রফিটা হয়তো ছোঁয়া হয়নি। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে বীরত্বের যে মহাকাব্য তিনি লিখে গেছেন, তা কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয়! বিদায় হে কীর্তিমান তপস্বী, বিদায় হে পর্তুগিজ নাবিক! আপনার এই কান্নার জলছবি ফুটবলবিশ্ব কোনোদিন ভুলবে না।

আরও পড়ুন

×