ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

বাসযোগ্যতা সূচক

ঢাকার সংকট কোথায় 

ঢাকার সংকট কোথায় 
×

রাজধানী ঢাকা শহর (ফাইল ফটো)

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১৫

বিশ্বের শহরগুলো যখন স্বাস্থ্যসেবা, গণপরিবহন, নগর ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন ঢাকা হাঁটছে উল্টো পথে। একের পর এক আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতা সূচকে পিছিয়ে পড়ছে শহরটি। চলতি বছরের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে এক ধাপ পিছিয়ে বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহরের অবস্থানে নেমে এসেছে ঢাকা। একই সময়ে বিশ্বের সব অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে এশিয়ায়। কিন্তু সেই অগ্রগতির সুফল থেকেও কার্যত বিচ্ছিন্ন রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার প্রধান সংকট শুধু যানজট নয়। সমস্যার মধ্যে রয়েছে– অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনঘনত্বের অস্বাভাবিক চাপ, দুর্বল গণপরিবহন, অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা, বায়ু ও শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা ও নগর সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা।

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) মঙ্গলবার ২০২৬ সালের যে ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স’প্রকাশ করেছে তাতে ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ১০০ নম্বরের মধ্যে ঢাকার সামগ্রিক স্কোর ৪২। ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক এবং লিবিয়ার ত্রিপোলি। অর্থাৎ যুদ্ধবিধ্বস্ত দুটি শহর বাদ দিলে বিশ্বের আর কোনো শহরই ঢাকার চেয়ে কম বাসযোগ্য নয়। এই সূচক মূলত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগকে বিদেশে কর্মরত কর্মীদের জীবনযাত্রার মান, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা মূল্যায়নে সহায়তা করার জন্য তৈরি করা হলেও সময়ের সঙ্গে এটি বিশ্বের শহরগুলোর জীবনমান পরিমাপের অন্যতম গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। সরকার, বিনিয়োগকারী, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং গবেষকরা শহরের শক্তি ও দুর্বলতা মূল্যায়নে এই সূচক ব্যবহার করেন।

ঢাকার অবস্থান এক বছরের ব্যর্থতার ফল নয়। বরং গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে অবনতি হচ্ছে শহরটির। ২০২১ সালে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৩৭তম। ২০২২ সালে ১৭২টি শহরের মধ্যে ১৬৬তম। ২০২৩ সালেও ১৭৩টি শহরের মধ্যে একই অবস্থানে ছিল। ২০২৪ সালে আরও পিছিয়ে ১৬৮তম স্থানে নেমে যায়। ২০২৫ সালে অবস্থান হয় ১৭১তম। আর এ বছর একই অবস্থানে থেকে বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর হিসেবে রয়ে গেছে ঢাকা।

ইআইইউ পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে শহরগুলোর বাসযোগ্যতা মূল্যায়ন করে। এগুলো হলো–স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো। এর মধ্যে ঢাকার স্কোরগুলো হলো– স্থিতিশীলতা ৪৫, স্বাস্থ্যসেবা ৪২, সংস্কৃতি ও পরিবেশ ৪১, শিক্ষা ৬৭ এবং অবকাঠামো ২৭। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অবকাঠামোতে মাত্র ২৭ নম্বর পাওয়া। অর্থাৎ সড়ক, গণপরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ, বাসস্থান ও নগরসেবার মানই ঢাকার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। শিক্ষা খাত তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও সেই অর্জন সামগ্রিক বাসযোগ্যতার মান বাড়াতে পারেনি।

ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় নাগরিক সুবিধা ও জনঘনত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যাচ্ছে না। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এবং বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন নেই। যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, তার অনেকটাই পরিকল্পনার মানদণ্ড পূরণ করছে না। 

তিনি বলেন, বাসযোগ্য শহরের অন্যতম শর্ত উন্নত গণপরিবহন। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও বাসভিত্তিক শৃঙ্খলাবদ্ধ গণপরিবহন গড়ে ওঠেনি। সরকার অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্ব দিলেও গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার হয়নি। ফলে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং যানজট আরও বাড়ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, ঢাকায় নাগরিক সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহির অভাব রয়েছে। কেন শহরটি ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকরভাবে জবাবদিহি করে না। অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশের দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি। বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা চলতে থাকলে তাকে আধুনিক গণপরিবহন বলা যায় না। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতেও ঢাকার বাসযোগ্যতায় বড় ধরনের উন্নতির সম্ভাবনা কম।

বর্তমানে এশিয়ার ৫৮টি শহরের গড় স্কোর প্রায় ৭৪, যা পূর্ব ইউরোপের গড়েরও ওপরে। কিন্তু ঢাকার স্কোর ৪২। অর্থাৎ আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে প্রায় ৩২ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এশিয়ার উন্নয়নের সুফল সমানভাবে বণ্টন হয়নি। ঢাকার মতো নিম্ন স্কোরের শহরগুলো পুরো অঞ্চলের গড়কে নিচের দিকে টেনে ধরছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যেও ঢাকার অবস্থান সবচেয়ে খারাপের দিকে। পাকিস্তানের করাচি রয়েছে ঢাকার ঠিক এক ধাপ ওপরে, ১৭০তম স্থানে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভও ঢাকার চেয়ে এগিয়ে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শহর যুদ্ধের প্রভাবে পিছিয়ে গেলেও ঢাকার অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার কারণ যুদ্ধ নয়; বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল অবকাঠামো, পরিবেশ দূষণ, নগর শাসনের সংকট এবং জনঘনত্ব।


 

আরও পড়ুন

×