ঢাকা বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

হামের পরবর্তী জটিলতায় চোখের সমস্যায় রোগীরা

আক্রান্ত ৩৫০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন, কর্নিয়া নষ্ট একজনের

হামের পরবর্তী জটিলতায় চোখের সমস্যায় রোগীরা
×

 তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

হাম-পরবর্তী গুরুতর জটিলতার একটি হচ্ছে চোখের সমস্যা। যথাসময়ে চিকিৎসা না নিলে স্থায়ী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। হামের ভাইরাস সরাসরি চোখের টিস্যুকে আক্রান্ত করতে পারে, আবার রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে হামের শারীরিক উপসর্গ কমে যাওয়ার পর চোখে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কনজাংটিভাইটিস বা চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কর্নিয়ায় প্রদাহ এবং কিছু ক্ষেত্রে কর্নিয়ায় ক্ষত বা আলসার।

গত সাড়ে তিন মাসে প্রায় ৩৫০ জন রোগী হাম-পরবর্তী চোখের জটিলতায় চিকিৎসা নিয়েছেন। জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দুইশর বেশি শিশু একই ধরনের জটিলতায় চিকিৎসা নিয়েছে। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের এক চিকিৎসকও এ ধরনের পঞ্চাশের বেশি রোগী দেখেছেন। কর্নিয়া বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ মাসুদুল হাসানের ব্যক্তিগত চেম্বারে এমন প্রায় ১০০ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।  

তৃপ্তি বিশ্বাসের (ছদ্মনাম) বয়স ৩০। পেশায় চিকিৎসক। থাকেন রাজধানীর মিরপুরে। গত মাসে তিনি হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কয়েক দিন জ্বর, শরীরে র‍্যাশ ও দুর্বলতা ছিল। পরে শরীর কিছুটা ভালো হলেও নতুন সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমে চোখ লাল হয়ে যায়। পরে দৃষ্টি ঝাপসা হতে থাকে। চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে। আলো সহ্য করতে পারতেন না। 
তিনি সমকালকে বলেন, ‘চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে জানতে পারি, হামের কারণেই চোখে সমস্যার হয়েছে।’

ডা. মোহাম্মদ মাসুদুল হাসান বলেন, বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ কিছুটা কমার পর চোখে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। প্রথম দিকে চোখ লাল হওয়া বা কনজাংটিভাইটিস দেখা গেলেও মূল জটিলতা শুরু হয় কর্নিয়া আক্রান্তের মাধ্যমে। রোগীরা প্রথমে ঝাপসা দেখা শুরু করেন, চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে এবং আলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হয়। অনেকের ফটোফোবিয়া হয়।

মাসুদুল হাসান বলেন, পুষ্টিহীনতা বা ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় কর্নিয়ায় আলসার বা ঘা তৈরি হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে সেই ক্ষত থেকে কর্নিয়ায় ছিদ্র পর্যন্ত হতে পারে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই হামের পর চোখের সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। রোগী আইসোলেশনে থাকাকালেও  চোখের সমস্যা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। 

হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. বজলুল বারী ভূঁইয়া বলেন, হামে আক্রান্ত হয়ে কনজাংটিভাইটিস ও কর্নিয়া-সম্পর্কিত জটিলতা নিয়ে অনেক রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শিশুর পুষ্টি ঠিক থাকলে শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে হামজনিত চোখের সংক্রমণ ধীরে ধীরে সেরে যায়। তবে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হলে দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে, তীব্র ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, কানে সংক্রমণ হতে পারে, নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ছাড়া এনসেফালাইটিসের কারণে মস্তিষ্কে প্রদাহ হলে স্থায়ী ক্ষতিও হতে পারে। 

ডব্লিউএইচও সুপারিশ করেছে, হামে আক্রান্ত সব শিশুকে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভিটামিন ‘এ’-এর দুটি ডোজ দেওয়া উচিত। ভিটামিন ‘এ’ চোখের ক্ষতি, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশু ও অপুষ্টিপ্রবণ এলাকায় এর গুরুত্ব বেশি।

শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হামে আক্রান্ত হওয়ার পর শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’ কমে যায়। এর ফলে চোখ শুকিয়ে যেতে পারে এবং চোখের ক্ষতি হতে পারে। তিনিও তাঁর ব্যক্তিগত চেম্বারে হামে আক্রান্তের পর চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছে এমন রোগী পেয়েছেন বলে জানান।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, অপুষ্ট শিশু হাসপাতালে এলেই তাকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন ‘এ’ দিতে হবে। মাকেও ভিটামিন ‘এ’ দিতে হবে, যেন মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশুও তা পায়। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের অপুষ্ট শিশুদের সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।

হামের পরিস্থিতি
হামের উপসর্গ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৯৯২ শিশু। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৭৩ জনের এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৮১৯ জন। নতুন করে মারা যাওয়া শিশুটি ঢাকার বাসিন্দা। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

 

আরও পড়ুন

×