অন্যদৃষ্টি
ট্রাম্প ১, বেলজিয়াম ৪
মেরিনা হাইড
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আহা! মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাদের হয়ে এত নির্লজ্জভাবে জোচ্চুরি করার পরও আমেরিকার ফুটবল দলটা হেরে গেল। ভাবা যায়! তবে যাক, ঘটনাটা অন্তত গোটা বিশ্বকে এক জায়গায় এনেছে। এর আগে এত মানুষকে একসঙ্গে বেলজিয়ামের প্রতিরোধের জন্য গলা ফাটাতে দেখা গিয়েছিল ১৯১৪ সালে, যখন জার্মানরা সবেমাত্র ‘মিউজ’ নদী পার হচ্ছিল। আপনারা হয়তো ইতোমধ্যে জেনে গেছেন, সোমবার রাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজেদের বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছে বেলজিয়ামের কাছে পরাজয়ের মাধ্যমে। আর এটা হয়েছে ঠিক তখনই, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প বুক ফুলিয়ে দাবি করছিলেন, মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড বাতিলের জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনোকে তিন-তিনবার ফোন করে হস্তক্ষেপ করেছেন। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন– আমেরিকা ফুটবলেও জোচ্চুরি করে। কথাটা ছড়িয়ে দিন।
এই টুর্নামেন্টজুড়ে আপনারা ‘শিটহাউসারি’ শব্দটা নিশ্চয় অসংখ্যবার শুনেছেন। এরই মধ্য দিয়ে মাঠে নোংরা বা চাতুর্যপূর্ণ কাণ্ড ঘটনাকে বোঝায়। এমনকি আমরা অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ্য করেছি, কিছু মার্কিন ধারাভাষ্যকার তাদের কথাবার্তায় শব্দটা ব্যবহার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। ভাইসব, দয়া করে একটু থামুন– না, এটা আপনাদের জন্য নয়। ট্রাম্প নিজেই পরিষ্কার করে দিয়েছেন– বালোগানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসায় তিনি দুশ্চিন্তায় একেবারে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। সোমবার সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি অনর্গল আজেবাজে বকছিলেন। সেখানে তিনি বলেছেন, সপ্তাহান্তে তিনি অত্যন্ত অনুচিতভাবে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন। কারণ ‘আমি এসব কাজে বেশ ওস্তাদ!’ আচ্ছা, তাই বুঝি? ট্রাম্প সত্যি সত্যি ভেবেছিলেন, তিনি জাতীয় দলের হয়ে এখানে ‘ব্যাটিং’ করতে নেমেছেন। এই দৃশ্যটা কেমন যেন অদ্ভুত এক করুণ রসের জন্ম দেয়।
খেলার ক্ষেত্রে এর জবাব হলো, হায় আল্লাহ, ওকে ব্যাট করতে দেবেন না! ওর হালটা দেখুন! ও তো ব্যাটই হাতে নিতে পারবে না! অদ্ভুত ব্যাপার যে, ট্রাম্প নাকি খেলাধুলা সম্পর্কে অনেক কিছু বোঝেন। কিন্তু এটা বোঝেন না, আপনি যদি চরম অন্যায় কিছু করেন, আপনার প্রতিপক্ষরা প্রায়ই সেই অন্যায়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উজ্জীবিত করে আপনাকে হারিয়ে দেয়। কিন্তু কী আর করা। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম যে জরাজীর্ণ গলফ ম্যাচগুলোতে ট্রাম্পকে দেদার চিটিং করতে দেন, সেখানকার নিয়ম হয়তো আলাদা। ২০২২ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী জালিয়াতি মামলায় এক গ্র্যান্ড জুরির সামনে গ্রাহাম বলেছিলেন, ‘লোকে বলে, আপনি হয়তো ট্রাম্পের চেয়ে দূরে বল মারতে পারবেন। কিন্তু আপনি কোনোভাবেই তাঁর ক্যাডির চেয়ে দূরে মারতে পারবেন না। যা হওয়ার তা তো হবেই।’
অনেকেরই বালোগানের জন্য সত্যি সত্যি করুণা হচ্ছে। বেচারা কোনোদিন চাননি, প্রেসিডেন্টের এই কুৎসিত ও নোংরা অবয়বটি তাঁর পক্ষ নিয়ে দাঁড়াক। আসলে লন্ডনে বড় হওয়া বালোগানের এটা আরও চাওয়ার কথা নয়। কারণ এই বালোগান ঠিক সেই শ্রেণির মানুষ, যাদের জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য ট্রাম্প মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়েছিলেন, যতক্ষণ না গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট তার সেই চেষ্টাকে পুরোপুরি নাকচ করে দিলেন। তবে ওই যে কথায় বলে– যা হওয়ার তা তো হবেই।
কোনো ফুটবল ম্যাচই এতখানি পাতানো বা ফিক্সড হতে পারে না, যতখানি ফিক্সড ফিফাতে ইনফান্তিনোর প্রেসিডেন্সির সময় হয়েছে। এমনকি ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র যদি ঘুষের দায়ে অভিযুক্ত ১৯৯৩ সালের মার্সেই দলের বিরুদ্ধে খেলত এবং ম্যাচ রেফারি হতেন দুর্নীতির বরপুত্র সেই জার্মান রেফারি রবার্ট হয়জার– তাও ইনফান্তিনোর এই ব্যবস্থার চেয়ে বেশি পাতানো হতো না। ইনফান্তিনো নিজের সংস্থার ভেতর এই মুহূর্তে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন। কারণ ইউরোপের বাইরের সদস্য দেশগুলোকে তিনি যেভাবে সুযোগ-সুবিধা আর উন্নয়নের টাকা বিলিয়ে নিজের পকেটে পুরেছেন, তা অবিশ্বাস্য।
মেরিনা হাইড: দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক; সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি