কনটেইনার গায়েব
সমন্বয়হীনতা নাকি সুশাসনের সংকট
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম বন্দর হইতে অদৃশ্য সন্দেহভাজন ২৫০টি পণ্যবোঝাই কনটেইনার। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলিতেছে, তাহারা একাধিক সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট ঐগুলির হদিস জানিতে চাহিয়া পত্র দিয়াও সদুত্তর পায় নাই। অপরদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করিতেছে, ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন’ করিতেই এইরূপ অভিযোগ। কনটেইনারের সংখ্যা ২৪৭; সকল কনটেইনার-কার্গো কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নিকট দাপ্তরিকভাবে হস্তান্তর হইয়াছে। বন্দরে কনটেইনার অদৃশ্য হওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি এমন সময় জনসমক্ষে আসিল যখন এক বৎসরের মধ্যে বন্দর হইতে অন্তত তিনটি পূর্ণ কনটেইনার নিখোঁজ হইবার তদন্ত চলিতেছে। ইহার মধ্যে একজন ব্যবসায়ী তাঁহার প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের পণ্যবোঝাই একখানি কনটেইনার খুঁজিয়া পান নাই। বন্দর কর্তৃপক্ষ এক পর্যায়ে স্বীকার করিয়াছে, তাহারা কনটেইনারটির হদিস দিতে ব্যর্থ।
এইবার আড়াইশ কনটেইনার নিখোঁজ লইয়া যেই আলোচনা শুরু হইয়াছে, তাহাতে গুরুত্ব পাইয়াছে সমন্বয়হীনতাই প্রধান কারণ। ব্যাপক অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়া যাইবার বাধ্যবাধকতা থাকিবার পরও দেশের অন্যতম সুরক্ষিত নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করিয়া কীভাবে কনটেইনার বাহিরে চলিয়া যাইতে পারে, তাহা লইয়া বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম হইয়াছে।
সমকালে প্রকাশিত মঙ্গলবারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হইয়াছে, চোরাচালান, পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা কিংবা শুল্ক ফাঁকি সন্দেহে এই সকল কনটেইনার লক করিয়া রাখিয়াছিল কাস্টমস হাউস। জাল সিল, ভুয়া স্বাক্ষর এবং গেট পাসের জাল নথিপত্র ব্যবহার করিয়া বন্দর ও কাস্টমসেরই এক শ্রেণির কর্মকর্তার যোগসাজশে এই সকল কনটেইনার খালাস করিয়াছে জালিয়াত চক্র। এখন উভয়ে দুষিতেছে উভয়কে।
প্রশ্ন হইতেছে, এই সমন্বয়হীনতা কেন তৈয়ার হইয়াছে? দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার বন্দর। আর সেই বাণিজ্যের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও রাজস্ব নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব কাস্টমসের। এই দুইটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত কার্যক্রমের উপর নির্ভর করিয়া দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা তৈয়ার হইয়া থাকে। কিন্তু বাণিজ্য ক্ষেত্রে দেশের এইরূপ গুরুত্বপূর্ণ দুই কর্তৃপক্ষের বর্তমান আচরণ বিব্রতকর। এই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছেন
বন্দর ব্যবহারকারীরা। তাহারা বলিতেছেন, যাহাদের নিকট পণ্য সুরক্ষিত থাকিবার কথা, তাহাদের নিকট হইতেই যদি গায়েব হইয়া যায়, তাহা হইলে ব্যবসায়ীরা কোথায় যাইবেন?
আরও একখানি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্মুখে আসিয়াছে। কনটেইনারে কী ছিল? যদি উহা উচ্চমূল্যের পণ্য হইয়া থাকে, তাহা হইলে রাষ্ট্রের বিপুল রাজস্বের ক্ষতি হইতে পারে। যদি নিষিদ্ধ দ্রব্য, মাদক, অস্ত্র বা চোরাচালান পণ্য হইয়া থাকে, তবে তাহা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। অর্থাৎ কনটেইনার লাপাত্তার বিষয়টি কেবল আর্থিক ক্ষতির বিষয় নহে; নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও প্রশ্ন।
স্বাভাবিকভাবেই কনটেইনারের যাত্রাপথ সুসংগঠিত হইবার কথা। জাহাজ হইতে পণ্য খালাস, ইয়ার্ডে সংরক্ষণ, কাস্টমসের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, শুল্ক পরিশোধ এবং নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানো– প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত হইয়া থাকে। কাস্টমস এজেন্টদের মতে, সাধারণত একটি পূর্ণ কনটেইনার খালাস করিতে বিভিন্ন দপ্তরের ২৪টি পৃথক স্বাক্ষর ও অনুমোদনের প্রয়োজন হইয়া থাকে। ফলে কনটেইনার গায়েব হইবার অর্থ হইল কোথাও না কোথাও নজরদারি ব্যবস্থা ভাঙিয়াছে। ইহা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সুশাসনের প্রশ্ন সম্মুখে আনিয়াছে। বৎসরের পর বৎসর ডিজিটালাইজেশনের চেষ্টা সত্ত্বেও ব্যবস্থাটি এখনও যে কতখানি সনাতনী ও নাজুক, আলোচ্য সংবাদের মধ্য দিয়া পুর্নবার উন্মোচিত হইল।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, বন্দর হইতে কোনো কন্টেইনার হারাইবার অবকাশ নাই এবং বিষয়টি চিঠি দিয়া ইতোমধ্যে কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে জানানো হইয়াছে। প্রশ্ন হইল, এই সমন্বয়হীনতা তৈরি হইল কেন?
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়