চিকিৎসা
হামের প্রকোপ, পুষ্টিহীনতা এবং গণদারিদ্র্য
শামসুল হুদা
শামসুল হুদা
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমরা সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য থেকেই জেনেছি, বিগত কয়েক মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে সাত শতাধিক শিশু প্রাণ হারিয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়েও অনেকে মারা গেছে। সংবাদমাধ্যম, বিশেষত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হাম ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ টিকার অভাব এবং সময়মতো তা ব্যবস্থা করতে না পারার সরকারি ব্যর্থতা।
এই বাস্তবতা স্বীকার করেও বিদ্যমান অন্যান্য কারণ বিবেচনা জরুরি। মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের মতে, পুষ্টিহীনতার শিকার শিশুরাই হামে বেশি আক্রান্ত ও কাবু হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কারণ শিশু যদি পুষ্টিহীন হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, বুঝতে হবে তার মা-ও পুষ্টিহীনতার শিকার। অনিবার্যভাবে এই পুষ্টিহীনতার পেছনে আছে দারিদ্র্য।
যেসব শিশু হামে মারা গেছে, তাদের নিয়ে জরিপ করা হয়েছে কিনা জানা নেই। হলে হয়তো দেখা যেত, অধিকাংশই অতিদরিদ্র বা নিম্নবিত্ত পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
এই দারিদ্র্যের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? তারা নানাভাবে সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য বৈষম্যের শিকার। তারা যে পরিমাণে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে, সে অনুপাতে তাদের আয়-রোজগার হয় না। তারা মজুরি বৈষম্যের শিকার। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই ভূমিহীন প্রান্তিক অবস্থানে থাকা কৃষক বা শ্রমিক। এদের কোনো কৃষিজমি নেই। কৃষি মজুর যারা তারা সবসময় কাজ পায় না। যখন পায় তখন নারীরা বিশেষভাবে শ্রমের মজুরি বৈষম্যের শিকার।
এসব বৈষম্যের কারণে তারা বৈষম্য-দারিদ্র্যের মধ্যেই বসবাস করে। ওইসব মা যখন শিশুর জন্ম দেয়, তখন তাদের শিশুরা পুষ্টিহীনতা সঙ্গে নিয়েই পৃথিবীতে আসে। আর পুষ্টিহীন শিশুরা সব সময় রোগ প্রতিরোধ শক্তির বিচারে বিপন্ন থাকে। রোগব্যাধি দ্রুত তাদের আক্রমণ করতে পারে। ন্যূনতম প্রতিরোধে যে পুষ্টি দরকার, সেটাও তাদের শরীরে থাকে না। যে কারণে টিকা দেওয়ার পরও অনেক শিশু মারা গেছে।
তদন্তে দেখা গেছে, সময়মতো টিকা না আসার কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলা, উদাসীনতা। কিন্তু এর পেছনে যে পুষ্টিহীনতা, তার কারণ অনুসন্ধানে কোনো তদন্ত হয়েছে কি? অবিলম্বে এ বিষয়ে গবেষণা দরকার। অবশ্য গবেষণা ছাড়াই বোঝা যায়, ভূমিহীন দরিদ্র, প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলোর আয়-রোজগারের উপায় নাগালের মধ্যে থাকে না। তারা সব সময় দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হয়। একপেটা, আধপেটা খেয়ে তাদের জীবন সংগ্রাম চালাতে হয়। তার মধ্যেই জন্মানো শিশুদের পুষ্টিহীন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
গ্রামীণ ও নগর দরিদ্রদের যে বিশাল জনসংখ্যা অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সর্বক্ষণ কোনো না কোনোভাবে অবদান রাখছে, তারা নিজেরা দুবেলা পেট পুরে খেতে পায় না। এই বিরাট জনগোষ্ঠীর জন্য ভূমি, জলা, খাসপুকুর ইত্যাদি সরকারি সম্পদে অভিগম্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। সেসব সুবিধা ব্যবহার করে যাতে উৎপাদক জনগোষ্ঠী মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে এবং অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখতে পারে, এ জন্য আলাদা কর্মসূচি গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
যদিও বর্তমান সরকার কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে উৎপাদক শ্রেণির মানুষকে সহায়তায় কিছু কর্মসূচি ইতোমধ্যে নিয়েছে, কিন্তু সেগুলো সব জায়গায় এখনও পৌঁছেনি। আর যদি সব জায়গায় পৌঁছায়ও, সেটা শুধু সাময়িক আর্থিক কষ্টের উপশম করতে পারে। পুষ্টিহীনতার মতো সমস্যা, যেটা প্রতিদিনের সুষম খাদ্যের ওপরে নির্ভরশীল, সেই ব্যবস্থা এতে হবে না। সেটা নিশ্চিত করতে হলে ভূমি ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন দরকার। বিশেষত সরকারের যে কৃষি খাসজমি ইতোমধ্যে বেহাত হয়ে গেছে, সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। আর যেগুলো হাতে আছে তা দ্রুত এদের মধ্যে বণ্টনের উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষিজমি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, প্রান্তিক ভূমি-দরিদ্র, জেলে, কৃষক নারী এবং অন্যান্য প্রান্তিক নারীর মধ্যে বিতরণের বিশেষ কর্মসূচি অবিলম্বে চালু করা দরকার।
টিকা না পাওয়া হামে আক্রান্ত হবার প্রধান কারণ বটে। এর পেছনে যে গণদারিদ্র্য, বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রেণিবৈষম্য বিদ্যমান, তা শনাক্ত না করলে স্থায়ী প্রতিকার মিলবে না। ওইসব বৈষম্য দূর করতে আরও ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আজকে হাম নিয়ে যে মহামারি হয়েছে, ভবিষ্যতে হয়তো অন্য কোনো রোগব্যাধির কারণে একই ধরনের দুর্যোগ দেখতে হবে। সেই দুর্ভাগ্য যাতে আমাদের দেখতে না হয়, সে জন্য কয়েকটি সুপারিশ সরকারের বিবেচনার জন্য উত্থাপন করছি।
এক. অবিলম্বে যেসব খাসজমি সরকারের হাতে আছে সেগুলো সঠিক তালিকা করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী, ভূমিহীন, প্রান্তিক, জেলে, নারী, আদিবাসী নারীসহ কৃষি দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণে জোরদার কর্মসূচি কার্যকর করতে হবে।

দুই. যেসব চর এলাকায় অনেক খাসজমি পড়ে আছে যেগুলো দিয়ারা জরিপের অভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া যাচ্ছে না। সেই দিয়ারা জরিপ একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আগামী এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এ জন্য বিশেষ কর্মসূচি সরকারকে হাতে নিতে হবে।
তিন. দিয়ারা জরিপ করতে গিয়ে এক শ্রেণির ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির মচ্ছবে মেতে ওঠে। তা শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে।
চার. রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লোকজনই এই দুর্নীতির বড় পৃষ্ঠপোষক ও উপকারভোগী। এই গোষ্ঠীকে দ্রুত চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় তাদের প্রতি নমনীয় হলে চলবে না।
পাঁচ. খাসজমির পরিমাণ এবং এ সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্য যেমন সরকারিভাবে রেকর্ডভুক্ত হওয়া দরকার, তেমনি ভূমিহীনদের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা করে তাদের নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা জরুরি। ইউনিয়ন, উপজেলাভিত্তিক যদি তালিকা থাকে, সেই তালিকার মধ্যে যারা অগ্রাধিকারযোগ্য তাদের কথা সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই খাসজমি বিতরণ করা সহজ হবে।
ছয়. যেসব খাসজমি ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে কিংবা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বেদখল করেছে বা অন্যায়ভাবে দখল নিয়ে অবৈধ দলিল বা অন্য কোনো পন্থায় জাল দলিল তৈরি করে মালিক সেজেছে, এগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং দরকার হলে প্রচলিত ভূমি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় পরিবর্তন এনে ১০-২০ বছর আগেও যদি কেউ বেআইনি দলিল করে কোনো জমি আত্মসাৎ করে থাকে, তাদের উচ্ছেদ করতে হবে।
সাত. এগুলো উদ্ধার করা গেলে ৪০ থেকে ৫০ লাখ একর খাসজমি, জলা সরকারের হাতে আসবে এবং ৫০ লাখ একর খাসজমি পাওয়া গেলে অন্ততপক্ষে ৫০ লাখ পরিবারকে পুনর্বাসন করা সম্ভব কৃষিতেই। এবং সেটা হলে আমাদের গ্রামীণ দরিদ্রের জীবনে একটা আমূল পরিবর্তন আসবে। তা কৃষি অর্থনীতিতেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে। গোটা বাংলাদেশের চেহারা বদলে যাবে।
শামসুল হুদা: অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের
(এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক
- বিষয় :
- শামসুল হুদা