তথ্য প্রযুক্তি
এআই বিরতি, নাকি সতর্ক অগ্রগতি?
সৈয়দ আলমাস কবীর
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআইর মতো বড় প্রতিষ্ঠান বলছে, এআই উন্নয়ন এত দ্রুত যে মানুষ একসময় এর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে। ‘ফিউচার অব লাইফ ইনস্টিটিউট’ এক খোলা চিঠিতে বলছে, শক্তিশালী এআই সিস্টেমের উন্নয়ন অন্তত কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কি এআই উন্নয়ন ও ব্যবহার কিছুদিনের জন্য থামানো উচিত? নাকি থামালে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে পড়ব? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কারণ এআই যেমন সুযোগ সৃষ্টি করে, তেমন ঝুঁকিও বাড়ায়।
দেশের শ্রমবাজারের অবস্থা পর্যালোচনায় এআই বিরতির পক্ষে কিছু শক্তিশালী যুক্তি তৈরি হয়। প্রথমত, দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি এখনও নাজুক। অনেক তরুণ উচ্চশিক্ষিত হয়েও চাকরি পাচ্ছে না। আবার যারা চাকরি করছে, তাদের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। এই বাস্তবতায় এআই যদি ক্রমশ বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয় করে ফেলে, যেখানে মানবকর্মী নিষ্প্রয়োজন, তাহলে নতুন করে বেকারত্ব তৈরি হতে পারে। বিশেষত ব্যাংকিং, কাস্টমার সার্ভিস, ডেটা এন্ট্রি, হিসাবরক্ষণ এমনকি মিডিয়ায় এআই ইতোমধ্যে মানুষের কাজ কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির দেশে এআই চালিত স্বয়ংক্রিয়তা হঠাৎ বড় ধাক্কা দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এআই চালিত অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে প্রোগ্রামিং, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল দক্ষতা– এসব প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের তরুণদের বড় অংশ এখনও এ ধরনের দক্ষতায় পিছিয়ে। ফলে এআই চালিত নতুন চাকরি তৈরি হলেও সেগুলো দখল করবে দক্ষ বিদেশি কর্মী বা দেশের খুব ছোট একটি অংশ। এতে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, ভুয়া তথ্য, অনলাইন হয়রানি– এসব সমস্যা এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই। এআই যদি আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে ভুয়া ভিডিও, ভুয়া খবর, পরিচয় চুরি ইত্যাদি ঝুঁকি বাড়বে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মতো সংবেদনশীল পরিবেশে এআই চালিত ভুল তথ্য বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
চতুর্থত, উন্নত দেশগুলো এআই নিরাপত্তা নিয়ে আইন তৈরি করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও এআই ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট নীতি বা বিধিমালা নেই। ফলে এআইর প্রসার নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
যুক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান, বাংলাদেশের মতো দেশে এআইর ব্যবহার ও উন্নয়ন কিছুদিনের জন্য থামিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন, নীতিমালা তৈরি এবং সামাজিক প্রস্তুতি নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।
এআই ব্যবহার ও উন্নয়ন বন্ধ রাখার বিপক্ষে শক্তিশালী যুক্তিও রয়েছে। প্রথমত, বিশ্ব দ্রুত এআইনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এআই খাতে ইতোমধ্যে বড় বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ যদি এর ব্যবহার বা উন্নয়ন থামিয়ে দেয়, আমরা প্রযুক্তিগতভাবে আরও পিছিয়ে পড়ব।
দ্বিতীয়ত, এআই নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করে। যেমন– ডিজিটাল মার্কেটিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা, এআই চালিত স্বাস্থ্যসেবা, ইকমার্স খাতে নতুন চাকরি বাড়ছে। বাংলাদেশ এআই গ্রহণ করলে তরুণরা বৈশ্বিক বাজারে কাজ করতে পারবে।
তৃতীয়ত, এআই ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। টার্গেটেড বা ফোকাসড নাগরিক পরিষেবার মাধ্যমে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে মানুষের জীবন সহজ করতে পারে।
চতুর্থত, গার্মেন্টস, কৃষি, ওষুধ, লজিস্টিকস খাতে এআই ব্যবহার করলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। যদি আমরা এআই ব্যবহার না করি, অথচ প্রতিযোগী দেশগুলো করে, তাহলে রপ্তানি বাজারে আমরা পিছিয়ে পড়ব।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের করণীয় কী? বিরতি, নাকি সতর্ক অগ্রগতি? একদিকে কর্মসংস্থান সংকট, দক্ষতার ঘাটতি, নীতিমালার অভাব ইত্যাদি কারণে এআই ব্যবহার বা উন্নয়ন থামানোর যুক্তিগুলো যথাযথ। অন্যদিকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নতুন চাকরির সম্ভাবনার কারণে এর ব্যবহার বা উন্নয়ন বন্ধ রাখা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।
তাই বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি ‘বিরতি’ নয়; বরং ‘সতর্ক অগ্রগতি’ই সবচেয়ে উপযুক্ত পন্থা। এর মানে, এআই উন্নয়ন চলবে, কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করতে হবে। স্বয়ংক্রিয়তার আগে শ্রমিকদের পুনর্দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। স্কুল-কলেজে ডিজিটাল দক্ষতা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভুয়া তথ্য ও অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি সেবায় এআই ব্যবহার হবে; একই সঙ্গে মানবিক নজরদারি বজায় থাকবে। শিল্প খাতে এআই ব্যবহার হবে, কিন্তু নতুন ধরনের কাজ সৃষ্টি করে শ্রমিকদের চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
এআই থামানো নয়, সঠিক পথে চালানোই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ; একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সুযোগ।
সৈয়দ আলমাস কবীর: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ আইসিটি অ্যান্ড ইনোভেশন নেটওয়ার্ক;
সাবেক সভাপতি, বেসিস
- বিষয় :
- প্রযুক্তি