সমকালীন প্রসঙ্গ
গ্যাসের ‘নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ’ মিলবে কীভাবে
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত ৩ জুলাই সমকালের প্রতিবেদনের শিরোনাম– ‘দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা বন্ধ’। এতে কেবল তৈরি পোশাক খাত থেকে দেড় লাখ শ্রমিকের কাজ হারানোর খবর রয়েছে। অন্যান্য খাত হিসাবে নিলে সংখ্যাটি অনেক বড় হবে।
প্রতিবছর কত মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, সেটা আমাদের জানা। এ অবস্থায় কর্মে নিয়োজিতরাও বিপুলভাবে বেকার হয়ে পড়লে পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। অনেকে নাকি কাজ হারিয়েছেন নতুন শ্রম আইনে উৎসাহিত হয়ে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ায়। এমনটি ঘটে থাকলে তা অগ্রহণযোগ্য।
খুঁজে দেখা চাই অসংগঠিত খাতের পরিস্থিতি কেমন। সেখানেই কিন্তু সিংহভাগ কর্মশক্তি নিয়োজিত। সেবা খাতে বহু শ্রমিক-কর্মচারী। গত অর্থবছরে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি হলেও সেখানে নিয়োজিত সবাই বছরজুড়ে উপার্জনে ব্যর্থ। সে কারণে গ্রামেই অন্যান্য খাতে কর্মনিয়োজন বেড়েছে। বাড়ছে শহরাঞ্চলে অভিবাসন। এ অবস্থায় শিল্পকারখানায় ‘টেকসই কাজের সুযোগ’ বাড়লে তা হতো ইতিবাচক।
শিল্প থেকে কাজ হারানোর অন্য দিকও রয়েছে। খাতটি সুবিধাজনক অবস্থায় থাকলে এমনটি ঘটত না। কোনো উদ্যোক্তাই চান না তাঁর কারখানা বন্ধ হয়ে যাক কিংবা সেটা চলুক অপূর্ণ সক্ষমতায়। সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়াতেও অনেক উদ্যোক্তা ছাঁটাইয়ে যাচ্ছেন। বিপুলসংখ্যক কারখানা ৫০-৬০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে বলে খবরও উদ্বেগজনক। এর একাংশ হয়তো অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আরও শ্রমিক কাজ হারাবেন। কাজ হারিয়ে অনেকে আবার বকেয়াসহ প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না। শ্রম আইন মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যর্থ উদ্যোক্তা কম নেই। তবে সফল উদ্যোক্তাদেরও ‘অভিন্ন যন্ত্রণা’ রয়েছে। এর একটি হলো গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট।
সংকটটি নতুন নয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সময় বলা হয়েছিল, এর নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেওয়া হবে। সেটা হয়নি। অন্তর্বর্তী শাসনামলে শিল্পের নতুন সংযোগে আবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল। সরকার এর সরবরাহ বাড়াতে নতুন পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছিল। বাস্তবে অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তার প্রমাণ বর্তমান গ্যাস পরিস্থিতি। গ্যাস দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় বলে লোডশেডিংয়েও ওই পরিস্থিতির প্রতিফলন মিলছে। গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ আবার করতে হয় আমদানি। বেড়েছে তাই এলএনজি-নির্ভরতা। ইরান যুদ্ধে এর প্রাপ্যতা কঠিন হওয়ায় দামও বেড়েছিল। তাতে আবার বিদ্যুৎ উৎপাদনে মাঝে বেড়েছিল কয়লানির্ভরতা।
বিদ্যুৎ যেখান থেকেই আসুক, সেটাও যথেষ্ট পরিমাণে মিলছে না। হালে গরম বাড়ায় লোডশেডিং বাড়ছে এবং এর চাপ পড়ছে শিল্পাঞ্চলেও। পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লোডশেডিংয়ে। বড় উদ্যোক্তারাও জানাচ্ছেন বিদ্যুৎ-বঞ্চনার কথা। বিকল্প হিসেবে গ্যাস ও ডিজেল জেনারেটর চালানোয় তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। হালে ডিজেলের দাম আবার বাড়াতে হয়েছে সরকারকে। যুদ্ধের উত্তাপ কমায় বিশ্ববাজারে দাম কমলেও দেশে ডিজেলের দাম কমানোর মনোভাব কিন্তু দেখা যাচ্ছে না।
আমদানি করা এলএনজির দামও কমে আসছে। তবে ‘স্পট মার্কেট’ থেকে বেশি কিনতে হলে এর ব্যয় কমবে না। সেসব হতাশাজনক খবরও রয়েছে। উদ্যোক্তারা চান, বিদ্যমান উচ্চ দামেও গ্যাসের সরবরাহ অন্তত অটুট থাকুক। বিদ্যুতের দাম কমানোর আশাও তারা করছেন না। তবে চান, এর উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি হোক। বিদ্যুতের স্থিতিশীল সরবরাহও চ্যালেঞ্জের। সংকট রয়েছে গ্যাস সংযোগেও। বাসাবাড়িতে এটা আর না দেওয়ার বিষয়টি না হয় মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু নতুন শিল্প কেন গ্যাস সংযোগ পাবে না? এদিকে সরকারের প্রতিশ্রুতিতে নতুন বিনিয়োগ করে একাধিক শিল্প গ্রুপের বিপদগ্রস্ত হওয়ার খবর রয়েছে। দীর্ঘদিনেও তারা গ্যাস সংযোগ পায়নি। এ কারণে তাদের ব্যাংক ঋণও খেলাপি হয়ে পড়েছে। সংকটে পড়েছে ব্যাংক খাতও। এমন একটি ঘটনার নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংককেও এগিয়ে আসতে হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে ঋণের উচ্চ সুদ নিয়ে। তবে তারা এর ‘বাস্তবতা’ মেনে নিয়েছেন। মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিতে সুদ কেন কমানো যাবে না– এটা তারা বোঝেন বলেই মনে হয়। তাদের অভিযোগ ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান তথা ‘স্প্রেড’ নিয়ে। হালে এটা কমাতে নতুন করে উদ্যোগী হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আশা, এতে ব্যাংকের মুনাফা কিছুটা কমলেও ঋণ গ্রহীতারা লাভবান হবেন। সরকার বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে বিশেষ তহবিল গঠনেও উদ্যোগী। স্বল্প সুদে চলতি মূলধন জোগানোর এ কর্মসূচির সাফল্য নিয়ে সংশয় কম নেই। তবে সঠিকভাবে তহবিলটি ব্যবহৃত হলেও প্রশ্ন হলো, উদ্যোক্তাদের অভিন্ন সমস্যা গ্যাস-বিদ্যুতের কী হবে? রুগ্ণ কিংবা বন্ধ কারখানার উদ্যোক্তাকেও তো এ সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। কিছু এলাকায় আবার গ্যাসের সমস্যা বেশি। এই সংকটে পড়ে কিছু উদ্যোক্তাকে কারখানা স্থানান্তরও করতে হচ্ছে। কাজটি কতটা জটিল, সহজেই বোধগম্য।
এই মুহূর্তে বিশেষত চট্টগ্রাম বিভাগে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করছে। এ অবস্থায় সমুদ্রে স্থাপিত এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এমন সংকট মাঝে মাঝেই ঘটতে দেখা যায়। শিল্পে এর চাপ কম নেই। শিল্পকারখানায় ‘নির্দিষ্ট চাপে’ গ্যাস না পাওয়ার সংকটও চলছে অনেক দিন ধরে। পূর্ণ সক্ষমতায় কারখানা পরিচালনা সম্ভব না হওয়ার এটা একটা কারণ। দেশ-বিদেশে পণ্যসামগ্রীর চাহিদা কমে আসার বাস্তবতাও রয়েছে। এ অবস্থায় বিশেষত পোশাক খাতে ক্রয়াদেশ কমার প্রবণতা লক্ষণীয়। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ তার অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কিনা– সে প্রশ্নও উঠেছে। এর নেপথ্যে আছে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারানোর কাহিনি। তাতে আবার আছে মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়ার করুণ বাস্তবতা। বিদ্যুৎ না হয় নিজস্ব ব্যবস্থায় উৎপাদন করে নেওয়া যায়। কিন্তু গ্যাস? এর বিকল্প কোথায়?
নতুন সরকারের স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগী হওয়ার খবর রয়েছে। এ কাজে প্রয়োজন বিপুল বিনিয়োগ ও সময়। কূপ সংস্কার করে দ্রুত এর সরবরাহ বাড়ানোও কঠিন। বাস্তবে দেশের ভেতর থেকে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহতভাবে কমছে। আপাতত এলএনজির আমদানি বাড়ানোর বিকল্প নেই। প্রয়াস থাকতে হবে নতুন উৎস থেকে লাভজনক চুক্তিতে আর ঝুঁকিমুক্তভাবে এটা আনার। হরমুজ সংকট আমাদের জন্য ছিল শিক্ষা। ভালো হতো এরই মধ্যে দেশে অনুসন্ধান বাড়িয়ে এর সরবরাহ বাড়ানো গেলে। গ্যাস সংকটে সার কারখানাও বন্ধ রাখতে হয়, যেটা দুর্ভাগ্যজনক। এ কারণে সারেও বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা! এদিকে ভোলার একাধিক জায়গায় গ্যাস মিললেও সেটা আবার কাজে লাগাতে পারছি না আমরা। পাইপলাইনে চালু শিল্পাঞ্চলে গ্যাস আনা কঠিন। তাই ভোলাতেই লাভজনকভাবে গ্যাস ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। শিল্পে এর ব্যবহার বাড়িয়ে অন্যান্য ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহারটাই আসলে কাম্য। কিন্তু শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরেই ভুগছে বাজে রকম গ্যাস সংকটে।
এ অবস্থায় বিনিয়োগ থেকে ছিটকে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। সংকটে পড়ছে অর্থায়নকারী ব্যাংক খাতও। পরিণতিতে আমানতকারীরা। আর এ প্রক্রিয়ায় কাজ হারাচ্ছে মানুষ। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা আবার বলা হচ্ছে এমন বাস্তবতাতেই। ব্যবসা সহজীকরণের উদ্যোগ রয়েছে। বিনিয়োগবান্ধব কর প্রস্তাব আর দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ঘোষণাও দেওয়া হচ্ছে বটে। কিন্তু গ্যাসের ‘নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ’– সেটা মিলবে কীভাবে?
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন