এমবাপ্পে-হাকিমি
বন্ধু তুমি শত্রু তুমি...
নাজমুল হক নোবেল
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৯:১২
তারা দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পিএসজিতে (প্যারিস সেইন্ট জার্মেইন) একসঙ্গে খেলেছেন বহুদিন। ২০২৪ সালে কিলিয়ান এমবাপ্পে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিলেও দুজনের বন্ধুত্বে কোনো ভাটা পড়েনি। প্রায়ই প্যারিস বা মাদ্রিদের কোনো রেস্তোরাঁ কিংবা রিসোর্টে আশরাফ হাকিমির সঙ্গে দেখা যায় এমবাপ্পকে। এ দুই প্রাণপ্রিয় বন্ধু আজ একে অপরের বিপক্ষে মাঠে নামছেন। বোস্টনে ফ্রান্স-মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনালে দুই বন্ধুর দ্বৈরথ ঘিরে ফুটবল দুনিয়ায় ভালোই আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
প্যারাগুয়েকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করার পরই হাকিমিদের সঙ্গে লড়াই নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল এমবাপ্পেকে। প্যারাগুয়ের সঙ্গে প্রায় মল্লযুদ্ধে পরিণত হওয়া ম্যাচ শেষে বেশ রাগান্বিত ছিলেন ফরাসি এই সুপারস্টার।
তবে কোয়ার্টারে হাকিমির সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার প্রসঙ্গ আসতেই হাসিমুখে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আশরাফ হাকিমি এরই মধ্যে আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে। আমরা জানি যে তারা খুবই শক্তিশালী একটি দল। এই অভিযান চলমান রাখতে আমরা নিজেদের সেরাটা দেব।’
অবশ্য খেলার মাঠে প্রতিপক্ষ হিসেবে এটাই দুই বন্ধুর প্রথম দেখা নয়। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপের সেমিতেও তারা মুখোমুখি হয়েছিলেন। তখন হাকিমি বন্ধুত্বের ছোঁয়া মাখা হুমকি দিয়ে টুইটও করেছিলেন– ‘শিগগিরই দেখা হবে বন্ধু।’ সেই সেমিতে ২-০ গোলে জিতেছিল ফ্রান্স। এবার তারা মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বকাপের কোয়ার্টারে। এবার অবশ্য প্রকাশ্যে হুমকি নয়, মোবাইলে বার্তা পাঠিয়েছেন হাকিমি।
এমবাপ্পে ও হাকিমির বন্ধুত্ব আধুনিক ফুটবলের অন্যতম আলোচিত ও অনুপ্রেরণাদায়ক একটি সম্পর্ক। ২০২১ সালে হাকিমি পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পরই দুজনের এই বন্ধুত্বের শুরু। তাদের দুজনের বন্ধুত্ব শুরুর কাহিনিটাও চমৎকার। দুজনেই সমবয়সী (দুজনের জন্ম ১৯৯৮ সালে) হওয়ায় পিএসজিতে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি। তাদের এই ঘনিষ্ঠতায় বড় ভূমিকা রাখে ভাষা ও ভিডিও গেমস। ইন্টার মিলান থেকে হাকিমি যখন পিএসজিতে আসেন, তখন তিনি ফরাসি বলতে পারতেন না। মাদ্রিদে জন্ম নেওয়া মরক্কোর এই ফুটবলার স্প্যানিশ বলতেন। এমবাপ্পে আবার ফরাসি ও স্প্যানিশ দুটোই পারতেন। তাই পিএসজির লকার রুমে হাকিমিকে অনুবাদক হিসেবে সহায়তা করতেন এমবাপ্পে। তখন থেকেই দুজনে একসঙ্গে ছুটিতে ঘুরতে যেতেন, ভিডিও গেমস খেলতেন। এমনকি ক্লাবের হয়ে ভ্রমণের সময় দুজনের পাশাপাশি সিটে বসাটা ছিল বাধ্যতামূলক। এমনকি দুজনের মধ্যে বন্ধনটা এতটাই চমৎকার ছিল যে পিএসজির লকার রুমেও তারা পাশাপাশি বসতেন।
শুধু বাইরে নয়, মাঠের ভেতরেও তাদের দুজনের সম্পর্ক ছিল দারুণ। পিএসজিতে এমবাপ্পের গোল উদযাপনে হাকিমি ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাঠের বাইরেও খেলার বিষয়ে তারা একে অপরকে অন্ধের মতো সমর্থন করতেন। এমনকি ক্যারিয়ারের কঠিন সময়ে তারা একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন সর্বস্ব দিয়ে। তারা ছিলেন ভাইয়ের মতো। হাকিমি অতিদ্রুত ফ্রেঞ্চ শেখার পেছনেও এমবাপ্পেকেই পুরো কৃতিত্ব দেন। ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিতে তাদের আচরণ বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল ফুটবলপ্রেমীদের। এ দুই খেলোয়াড়ের বন্ধুত্বের আসল সৌন্দর্য হলো, মাঠের বাইরের গভীর বন্ধুত্বকে তারা কখনোই পেশাদারিত্বের পথে বাধা হতে দেন না। জাতীয় দল কিংবা ক্লাবের হয়ে খেলার সময় তারা একে অপরকে একবিন্দু ছাড় দেন না। তবে রেফারির শেষ বাঁশির পর ঠিকই তারা বন্ধু হয়ে ওঠেন।
এই যেমন ২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ২-০ গোলের জয়ের পর ফ্রান্স শিবির যখন ফাইনালে ওঠার আনন্দে মাতোয়ারা, এমবাপ্পে তখন মরক্কো শিবিরে। তিনি ছুটে গেছেন প্রিয় বন্ধু হাকিমির খোঁজ নিতে। তিনি দেখেন, পরাজয়ের হতাশায় মাঠের ঘাসে শুয়ে আছেন হাকিমি। তাঁকে টেনে তুলে জড়িয়ে ধরেন এমবাপ্পে। হাকিমির সঙ্গে জার্সি বদল করে সঙ্গে সঙ্গে মাঠেই মরক্কোর সেই জার্সি পরে নেন এমবাপ্পে। হাকিমিও এমবাপ্পের জার্সি পরে বন্ধুত্বের মর্যাদা দেন। দুজন একে অপরের কাঁধে হাত রেখে মাঠও ছেড়েছেন। শুধু তাই নয়, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে হাকিমির পরিচয়ও করিয়ে দেন এমবাপ্পে। এবারও হয়তো দুজনের পেশাদারিত্ব ও বন্ধুত্বের আরও একটি নজির দেখবে ফুটবলবিশ্ব।
- বিষয় :
- কিলিয়ান এমবাপ্পে
- ফ্রান্স
- মরক্কো